বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী

(পর্ব-১, ভূমিকা)

বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন? যার হাত ধরে সে পৃথিবীর দুর্গম পথ পাড়ি দেবে। এমন চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খায়। বহু আকাক্সিক্ষত সে মনের মানুষটির অপেক্ষায় কেউ ধৈর্যধরে বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করে, আবার কেউ বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই ধৈর্যহারা হয়ে ভালো লাগার কোন একজনের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিয়ে ছাড়া যে ছেলেটি আজ যে মেয়েটির অথবা যে মেয়েটি আজ যে ছেলেটির হাত ধরে পথে-প্রান্তরে, পার্কে-পার্কে অথবা নির্জন কোন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে -তাদের এ সম্পর্কের কি আদৌ কোন ভিত্তি আছে? অথবা তারা গোপনে কোথাও মিলিত হয়ে নিজের মহামূল্যবান সততা ও সতিত্বকে যে বিসর্জন দিচ্ছে এবং তাতে জীবন ও যৌবনের যে অপরিসীম ক্ষতি হচ্ছে Ñসে বিষয়ে কি কোন ধারণা আছে? না নেই! বরং তারা আপাতঃ আবেগ, যৌন তাড়না ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নারী-পুরুষের চিরন্তন ও পবিত্রতম একটি সম্পর্কের মূলে ক্রমাগত কুঠার হানছে। তারা জানেনা, বিয়ে বিহীন যে মানুষটির হাত ধরে আজ ঘুরছে-ফিরছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, স্ফূর্তি ও মাস্তি-মউজ করে বেড়াচ্ছে Ñতাকে যতই আপন মনে হোক, প্রকৃতপক্ষে সে এসেছে শয়তানের পক্ষ থেকে। অন্ধ আবেগের বশে গড়ে ওঠা ঠুনকো প্রেমের সম্পর্ক সময়ের ব্যবধানে যখন কাঁচের মত ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন কচি মন ও দেহে যে কালো দাগ বসে যায়, তা কস্মিনকালেও মোছা যায় না। বাস্তবতা হল, পরবর্তীতে বিয়ের পর সত্যিকার আপনজনের বুকে যখন সে মাথা রাখে, তখন পূর্বতন অবৈধ সম্পর্কের জন্য মনে মনে ক্রমাগত অনুশোচনার দাবানলে পুড়তে হয়। জীবনের প্রকৃত আপনজনকে ঠকিয়ে দেয়ার যন্ত্রণা কখনো পিছু ছাড়ে না।

অপরদিকে যে ছেলে-মেয়েরা এ বিশ্বাস (ঈমান) অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে যে, একমাত্র বিয়ের মাধ্যমে যে মানুষটি তার সামনে এসে দাঁড়ায়, সে-ই কেবল মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উদ্দেশ্যে প্রেরিত সুখ-দুঃখের প্রকৃত সাথী। এছাড়া যে বা যারাই প্রেমের দোহাই দিয়ে কাছে আসে, সন্দেহাতীতভাবে তারা প্রেরিত হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। ফলে সে নিজেকে সর্বদা সংরক্ষণ করে চলে এবং অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকে। যত হ্যান্ডসাম তরুণ অথবা সুন্দরী তরুণী প্রপোজ করুক না কেন, তার সামনে ন্যুয়ে পড়ে না। বরং নিজের তারুণ্য ও যৌবনকে স্রষ্টার আমানত হিসেবে পবিত্র রাখে এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। 

বিয়ের পিঁড়িতে বসার পূর্ব পর্যন্ত সময়টুকু প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের জন্য আঁকাবাঁকা রাস্তায় প্রবল গতিতে বাইক চালানোর মত ঝুঁকিপূর্ণ। একটুখানি অসাবধানতা কিংবা ভুলের কারণে ঘটে যেতে পারে ভীষণ বিপদ। কথায় আছে- একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। ফলে বয়সের তাড়নায় গড়ে ওঠা আবেগ নির্ভর বিয়ে বহির্ভূত যে কোন সম্পর্ক জীবনকে ঠেলে দিতে পারে সমূহ বিপদের মুখে! যে বিপদ থেকে অধিকাংশের পক্ষেই কখনো উদ্ধার হওয়া সম্ভব হয় না। প্রকৃতপক্ষে নারী-পুরুষের বৈধ, মর্যাদাপূর্ণ, স্থায়ী ও সঠিক সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হল বিয়ে। একমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই নানামুখী বাছবিচার এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা সম্ভব হয়। 

তাহলে ছেলে-মেয়েদের মনের গহীনে জীবন সঙ্গী বা জীবন সঙ্গীনীর যে ছবি আঁকা থাকে এবং তাকে আপন করে কাছে পাবার যে তীব্র বাসনা অন্তরজুড়ে বিরাজ করে তার কি হবে? তারা কি তাহলে মাসের পর মাস বছরের পর বছর শরীর ও মনের ক্ষুধা নিবারণ করতে গিয়ে নিজের বিরুদ্ধে লড়াই করবে? আমাদের দেশের বস্তবতার আলোকে যে লড়াইয়ের মেয়াদকাল বয়ঃসন্ধি থেকে আরম্ভ করে বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫-২০ বছর? অতঃপর যখন কারও দয়া হবে অথবা অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকাবে, তখন চোখের সামনে বুড়িয়ে যাওয়া ছেলেটি বা মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলবে, আরে! একে তো দ্রুত বিয়ে করানো দরকার। পরেতো কেউ মেয়ে বিয়ে দিবে না! অথবা, কেউ তাকে বিয়ে করবে না! বিশেষকরে মেয়েদের বেলায় সমাজে তো একটি কথা প্রচলিতই আছে যে, কুড়িতে বুড়ি।

কক্ষনো না! এটি মোটেও যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত পন্থা নয়। বিশ্বাস করুন, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের দেহ ও মনের মাঝে নারী-পুরুষ একে অন্যের  প্রতি যে দুর্বার আকর্ষণ ও মোহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তা দীর্ঘকাল দমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোধ করা তাঁর বিধান নয়। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে তা হল, প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর দৈহিক ও মানসিকভাবে সুগঠিত হলে যে কেউ নিজের পছন্দনীয় মানুষের সাথে দ্বিধাহীন চিত্তে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। বিয়ের মাধ্যমেই একে অন্যের কাছে আসবে এবং পরস্পর মানসিক ও দৈহিক সম্পর্কে অবতীর্ণ হবে। এটিই হল ইসলামী শরীয়াতের আলোকে নারী-পুরষের সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র গ্রহনযোগ্য পন্থা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন-

“নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের যাকে ভালো লাগে, তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও।” (সূরা নিসা, আয়াত-০৩)

মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মাদ সা. সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন-

“হে তরুণ সমাজ, তোমরা যারা সক্ষম হয়েছো, তারা দ্রুত বিয়ে করে নাও।” (সহীহ আল-বুখারী)

কতিপয় লোক অধিকতর দ্বীনদারিতার অজুহাতে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকার অনুমতি চাইলে নবিজী সা. অত্যন্ত পরিস্কার ভাষায় তা নাকচ করে দেন এবং নবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের বৈবাহিক জীবনের কথা তুলে ধরে তাদেরকে বিয়ে করার নির্দেশ দেন। এতে প্রমাণিত হয়, বিয়ে করাই হল প্রকৃত দ্বীনদারিতার। দ্বীনদারিতার নামে পরিবার-পরিজন ছেড়ে নিরলে বসবাস করা এবং সমাজ-সংসার পরিত্যাগ করে একাকী জীবন যাপন করার অনুমোদন ইসলামে নেই। নবী সা. অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইসলামে বৈরাগ্যবাদের কোনও স্থান নেই। (সহীহ আত-তিরমিজী)

বিয়ে সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য হল, প্রাপ্তবয়ষ্ক হলে ছেলে-মেয়েরা শরীয়ত সম্মত পন্থায় নিজের পছন্দমত (শুধুমাত্র যাদেরকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ তারা ব্যতীত) যে কারোর সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার রাখে। এ অধিকার স্রষ্টা প্রদত্ত। কাজেই তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের কথা বাবা-মা কিংবা অভিভাবকদের নিকট নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারে এবং নিজের মতামত খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করতে পারে। এতে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোন বাধা নেই এবং বেয়াদবিরও কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ অভিভাবক যথাসময়ে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে উদাসিন। কিন্তু কেউ যখন মুখ ফুটে বিয়ের কথা বলে, তখন সেটিকে চরম বেয়াদবি মনে করে। যেন বিয়ের কথা মুখে আনা মস্তবড় অপরাধ! এমনকি অনেককে বলতে শুনা যায়ঃ

“-বিয়ে করতে চাও? সাহস তো কম না!”

“-আগে নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপর বিয়ের কথা চিন্তা করো।”

“-বিয়ে করে কি খাওয়াবে?”

“-চাকুরি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।”

“-সরকারী চাকুরিজীবী হতে হবে।”

“-ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট হতে হবে।”

ইত্যাদি অজুহাতে ছেলে-মেয়েদের বয়স চলে যায় এবং বিয়ে ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকে।

অপরদিকে বর্তমানে এমন এক অবস্থা বিরাজ করছে যে, ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশাকে সমাজ যেন স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে। জাস্ট ফ্রেন্ড, বাবু, জানু ইত্যাদির নামে পার্কে ঘুরাঘুরি করা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফূর্তি করা এবং লিভ-টুগেদারের নামে সুস্পষ্ট ব্যাভিচারে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে তরুণ সমাজ। আজকাল অনেক বাবা-মা এর সম্মতিতেও ছেলে-মেয়েরা প্রকাশ্যে এ সকল শয়তানি কর্মকান্ড করে বেড়াচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা এবং বিয়ে বহির্ভুত অবৈধ সম্পর্কের ফলে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা আজ হুমকির মুখে। ক্রমাগত বেড়ে চলেছে মাদক, নেষা, ধর্ষণ, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন ইত্যাদি অপরাধ। অথচ সমাজকে সুস্থ রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিকপথে পরিচালিত করতে ইসলাম বিয়ের মত কতই না সুন্দর ও বাস্তবসম্মত বিধান দিয়েছে। কিন্তু অজ্ঞতাবশতঃ অধিকাংশ অভিভাবক তা মানছে না এবং সমাজও অযৌক্তিক কিছু কারণে বিয়ের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। ফলে সমাজে এখন বিয়ে কঠিন কিন্তু ব্যভিচার সহজ! যা সুস্পষ্টরূপে স্রষ্টার বিধানের বিপরীত অবস্থান গ্রহন করা এবং মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিরোধী কাজ। অতএব এ ধ্বংসাত্মক অবস্থান থেকে সকলকে দ্রুতই প্রস্থান করতে হবে এবং বাস্তবসম্মত পন্থা অনুসরণ করতে হবে। 

(চলবে)

লেখক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে