পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণ নবাবের প্রধান সেনাপতিসহ অধিকাংশ সেনাপতিরা যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থেকেও যুদ্ধ না করে বরং ইংরেজদের সাথে পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন করেছিল এই প্রহসনের যুদ্ধে।

পলাশী ষড়যন্ত্রের যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল; সকলেরই মৃত্যু হয়েছিল মর্মান্তিকভাবে। কাউকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, কেউ দীর্ঘদিন কুষ্ঠ রোগে ভুগে মারা গেছে, কাউকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়েছে, কাউকে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে, কেউ নিজের গলায় নিজেই ছুরি বসিয়েছে। নিচে এ সব ষড়যন্ত্রকারীরা কিভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল তা উলে­খ করলাম।

মিরন

মিরন পলাশী ষড়যন্ত্রের অন্যতম খলনায়ক। সে মীরজাফরের জ্যোষ্ঠ পুত্র। মিরন যে অত্যন্ত দুর্বৃত্ত, নৃশংস ও হীনচেতা ছিল সে ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। সিরাজ হত্যাকান্ডের মূল নায়ক মিরন। আমিনা বেগম, ঘষেটি বেগম হত্যার নায়কও সে। লুৎফুন্নিসার লাঞ্চনার কারনও মিরন। নবাব সিরাজদ্দৌলার ছোট ভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল মিরন। মীজাফরের সকল অপকর্মের হোতা সে। মিরনের প্ররোচনাতেই মীরজাফর চলত। এই মিরনকে হত্যা করে ইংরেজদের নির্দেশে মেজর ওয়ালস। তবে তার এই মৃত্যু ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
পাটনার নিকট সেনাছাউনিতে তাকে হত্যা করে তার তাবুতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রচার করা হয় বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়।

মুহাম্মদী বেগ

মুহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। নবাব সিরাজ এ সময় তার কাছে দু’রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু কুখ্যাাত মুহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজকে সে সুযোগ প্রত্যাখ্যান করার পরপরই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে মুহাম্মদী বেগ মাথা গড়বড় অবস্থায় বিনা কারণে কূপে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

মীরজাফর

পলাশী ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান নায়ক ছিল মীরজাফর। সে পবিত্র কোরআন মাথায় রেখে নবাব সিরাজের সামনে তাঁর পাশে থাকব বলে অঙ্গীকার করার পর পরই বেঈমানী করেছিল। সে ছিল সকল ষড়যন্ত্রের মূলে। মীরজাফর অত্যন্ত হীনাবস্থায় প্রথমত আলীবর্দী খাঁর সংসারে প্রতিপালিত হয়। আলীবর্দী খান তাকে অত্যন্ত কাছে টেনে নিয়েছিলেন। পরে নবাব নিজের বোন শাহ খানমের সাথে মীরজাফরের বিয়ে দেন। নবাব তার কার্যদক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সেনাপতি পদ প্রদান করেন। সে ছিল পুরোপুরিভাবেই একজন বিশ্বাসঘাতক। সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই সে ছিল একজন নির্বোধ, রাজনীতি জ্ঞানবিহীন একজন সেনাপতিমাত্র।
মীরজাফরের মৃত্যু হয় অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে। সে দুরারোগ্য কুষ্ঠব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও মহারাজা স্বরূপচাঁদ

পলাশী ষড়সন্ত্রের পিছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল জগৎশেঠ পরিবার, প্রথমত তারা ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং পরে মীরজাফর ও অন্যদের এতে য্্ুক্ত করে। আলীবর্দী খাঁর শাসনামলেই জগৎশেঠের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক অতি গভীর ছিল। নবাব সিরাজ ক্ষমতায় এলে এই গভীরতা আরো বৃদ্ধি পায় এবং তা ষড়যন্ত্রে রূপ নেয়। পলাশী বিপর্যয়ের পর জগৎশেঠ রাজকোষ লুন্ঠনে অংশ নেয়।

১৭৬০ সালে মীরজাফর সিংহাসনচ্যুত হলে তাঁর জামাতা কাসেম আলি খাঁ (মীর কাসেম) ক্ষমতায় বসে। এ সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ বাধে। জগৎশেঠ ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করে এবং সে ইংরেজ ও মীরজাফরের কাছে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে কয়েকটি পত্র প্রদান করে। পত্রগুলো কৌশলে মীর কাসেমের হস্তগত হয়। এ জন্য মীর কাসেম জগৎশেঠ মহাতপচাঁদকে বন্দী করে। ইংরেজ গভর্নর তার মুক্তির জন্য একটি পত্র প্রদান করে। কিন্তু মীর কাসেম তা প্রত্যাখান করে। এরপর ক্রমে ইংরেজদের সাথে মীর কাসেমের বিবাদ আরো গুরুতর হলে, নবাব কাটোয়া গিরিয়া, উধুয়ানালা প্রভৃতি স্থানে পরাজিত হয়ে জগৎশেঠ ও অন্যান্য রাজা বন্দী হত্যা করে এবং তাদের জমিদারী বিনাশ করে। জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও রাজা স্বরূপচাঁদকে দুর্গশিখর হতে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়।

রবার্ট ক্লাইভ

নবাব সিরাজবিরোধী ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি রবার্ট ক্লাইভ। ক্লাইভ খুব অল্প বয়সে ভারতে আসে। প্রথমে সে একটি ইংরেজ বাণিজ্য কেন্দ্রে গুদামের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়। এই কাজটি ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমের ও বিরক্তিকর। এই কাজটিতে ক্লাইভ মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। এ সময় জীবনের প্রতি তার বিতৃষ্ণা ও হতাশা জন্মে। সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে দ্রুত কোটি টাকার মালিক হয়। ইংরেজরা তাকে “প¬াসি হিরো” হিসেবে আখ্যায়িত করে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সে দেশে ফিরে যায় এবং বিচারের মুখোমুখী হয়। একদিন বিনা কারনে বাথরুমে ঢুকে নিজের গলায় নিজেই ক্ষুর চালিয়ে সে আত্মহত্যা করে।

ইয়ার লতিফ খান

পলাশী ষড়যন্ত্রের গুরুতে ষড়যন্ত্রকারীরা ইয়ার লতিফ খানকে ক্ষমতার মসনদে বসাতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এক্ষেত্রে মীরজাফরের নাম উচ্চারিত হয়। ইয়ার লতিফ খান ছিল নবাব সিরাজের একজন সেনাপতি। সে এই ষড়যন্ত্রের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল এবং যুদ্ধের মাঠে তার বাহিনী মীরজাফর, রায় দুর্লভের বাহিনীর ন্যায় ছবির মতো দাঁড়িয়েছিল। তার সম্পর্কে জানা যায়, তিনি যুদ্ধের পর অমহাকস্মাৎ নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যায়। অনেকের ধারণা, তাকে কে বা কারা গোপনে হত্যা করেছিল।

মহারাজা নন্দকুমার

মহারাজা নন্দকুমার এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। সিরাজের ভবিষ্যৎ ঘোরতর অন্ধকার দেখে, ইংরেজদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করে। পলাশী ষড়যন্ত্রের পর নন্দকুমারকে মীরজাফর স্বীয় দেওয়ান নিযুক্ত করে সব সময় তাকে নিজ কাছে রাখত। মীরজাফর তার শেষ জীবনে যাবতীয় কাজকর্ম নন্দকুমারের পরামর্শানুসারে করত। তহবিল তছরূপ ও অন্যান্য অভিগোগের বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু হয়েছিল।

রায় দুর্লভ
রায় দুর্লভ ছিল নবারের একজন সেনাপতি। সেও মীরজাফরদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। যুদ্ধকালে সে এবং তার বাহিনী মীরজাফরদের সাথে যুক্ত হয়ে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। যুদ্ধের পরে সে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয় এবং ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।

উমিচাঁদ
ক্লাইভ কর্তৃক উমিচাঁদ প্রতারিত হয়েছিল। ইয়ার লতিফ খান ছিল উমিচাঁদের মনোনীত প্রার্থী। কিন্তু যখন অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীর এ ক্ষেত্রে মীজাফরের নাম গোষণা করল, তখন উমিচাঁদ বেঁকে বসল এবং বলল, আপনাদের প্রস্তাব মানতে পারি এক শর্তে, তা হলো যুদ্ধের পর নবাবের রাজকোষের ৫ ভাগ সম্পদ আমাকে দিতে হবে। ক্লাইভ তার প্রস্তাব মানল বটে কিন্তু যুদ্ধের পরে তাকে তা দেয়া হয়নি। যদিও এ ব্যাপারে একটি মিথ্যা চুক্তি হয়েছিল। ওয়াট রমণী সেজে মীজাফরের বাড়িতে গিয়ে লাল ও সাদা কাগজে দু’টি চুক্তিতে তার সই করায়। যুদ্ধের পর ক্লাইভ তাকে সরাসরি বলে, তোমাকে কিছু দিতে পারবো না। এ কথা শুনে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং স্মৃতিভ্রংশ উন্মাদ অবস্থায়- রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতেই তার মৃত্যু ঘটে।

রাজা রাজবল¬ভ
ষড়যন্ত্রকারী রাজা রাজবল­¬ভের মৃত্যুও মর্মান্তিভাবে ঘটেছিল। রাজা রাজবলল­ভের কীর্তিনাশ করেই পদ্মা হয় কীর্তিনাশা।

ওয়াটসন
ষড়যন্ত্রকারী ওয়াটসন ক্রমাগত ভগ্নস্বাস্থ্য হলে কোন ওষুধেই ফল না পেয়ে কলকাতাতেই করুণ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়।

দানিশ শাহ বা দানা শাহ
দানিশ শাহ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেছেন, এই দানেশ শাহ নবাব সিরাজকে ধরিয়ে দিয়েছিল। একটা গ্রন্থে পাওয়া যায় বিষাক্ত সর্প দংশনে দানিশ শাহর মৃত্যু ঘটেছিল।

ওয়াটস্
ওয়াটস্ এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে উলে­খযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। তিনি রমণী সেজে মীরজাফরের বাড়িতে গিয়ে চুক্তিতে মীরজাফরের স্বাক্ষর এনেছিল। যুদ্ধের পর কোম্পানীর কাজ থেকে বরখাস্ত হয়ে মনের দুঃখে ও অনুশোচনায় বিলাতেই অকস্মাৎ মৃর্তুমুখে পতিত হয়।

স্ক্রাফটন
ষড়যন্ত্রকারী পিছনে স্ক্রাফটনও বিশেষভাবে কাজ করেছিল। জানা যায়, বাংলার বিপুল সম্পদ লুন্ঠন করে বিলেতে যাওয়ার পথে জাহাজডুবিতে তার হয়।

মীর কাসেম
মীরজাফরের ভাই রাজমহলের ফৌজদার মীর দাউদের নির্দেশে মীর কাসেম নবাব সিরাজের খবর পেয়ে ভগবানগোলার ঘাট থেকে বেঁধে এনেছিল মুর্শিদাবাদে। পরে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সে নবাব হয় এবং এ সময় ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ বাধে ও কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়। পরে ইংরেজদের ভয়ে হীনবেশে পালিয়ে যায় এবং রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। অবশেষে অজ্ঞাতনামা হয়ে দিল­¬ীতে তার করুণ মৃত্যু ঘটে।
এই ভাবেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকেরা পলাশী যুদ্ধের কিছুকালের মধ্যেই বিভিন্ন পন্থায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

All News

পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণRead More

ইচ্ছে

পরী