ঐশ্বরিক প্রেম ও রুমি

সিয়ামুর রহমান

ইশক এক নিখাদ প্রেমের নাম। ইশক-কে ইংরেজীতে PLATONIC LOVE বলা যায়। আজ আমরা জানার চেষ্টা করবো মানব মানবীর শরীর বৃত্তিয় প্রেমের বাইরেও যে আলাদা প্রেমের অস্তিত্ব থাকতে পারে সে সম্পর্কে। জানবো স্রষ্টার প্রেম সম্পর্কে। স্রষ্টা প্রেম এমন এক অমূল্য সম্পদ যা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে নিখাদ করে তাকে খাটি স্বর্ণে রুপান্তরিত করে।

ইশক তখনই পূর্ণতা পায় যখন আশিক (প্রেমিক) তার মাসুক (প্রেমাষ্পদ) এর রঙে রঞ্জিত হয়। একজন মানুষ আল্লাহকে প্রেম তখনই করতে পারে যখন সে আল্লাহর রাজী-খুশী অনুসারে তাঁর গুনগুলিকে অর্জন করার চেষ্টা করে। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে, অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হও

যখন একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহ প্রেমিক হতে পারে তখন সে জাগতিক পঙ্কিলতা অর্থাৎ, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য এগুলোর উর্ধে উঠতে পারে। আর তখনই সে হয় মাসুম নিষ্পাপ।

মুসলিম বিশ্বে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পর যে গ্রন্থটি বেশী পঠিত হয় তা হল মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী লিখিত মসনবী শরীফ

তরুণ অবস্থায় তিনি নামকরা পন্ডিত ছিলেন, গ্রন্থ কীটের মতো সবসময় বই এর সাগরে ডুবে থাকতেন।

ওই সময় মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমীর পীর (আধ্যাত্বিক শিক্ষক) শামস্ তাবরীজ [শীয়ারুল আওলিয়া গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যায় যে, তার প্রকৃত নাম খুজে পাওয়া যায় না, তাকে তাব্রীজের সূর্য বলা হতো] একজন প্রকৃত অনুসারী খুজতে বের হলেন যাকে তিনি দিয়ে যেতে পারেন তার অর্জিত সম্পদ ইশক বা নিখাদ আল্লাহ প্রেম।

শামস তাব্রীজ রুমীর সামনে গিয়ে দাড়ালেন। রুমী তখন বই পড়ায় গভীর ভাবে মগ্ন। শামস তাবরীজ বললেন, আচ্ছা, এই গ্রন্থ গুলো কী খুবই মূল্যবান?

রুমী উত্তর দিলেন, অবশ্যই। এর মূল্য আপনি বুঝবেন না।

শামস তাব্রীজ তখন রুমীর সমস্ত বইগুলো নিয়ে পাশের পানির চৌবাচ্চার মধ্যে ফেলে দিলেন।

মওলানা রুমী খুবই রেগে গেলেন। তাব্রীজ এর উদ্দেশ্যে বললেন, আপনি নিজে জ্ঞান রাখেন না, অথচ আমার এই মূল্যবান গ্রন্থ গুলি পানিতে ফেলে দিলেন।

তাব্রীজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন, এই গুলি যদি সত্যিই খুবই মূল্যবান হয়, তাহলে আমি তো তোমার অনেক ক্ষতি করে দিলাম, আচ্ছা, এই নাও।

এ কথা বলে মহান সাধক শামস তাব্রীজ পানির মধ্যে হাত ডুবিয়ে বইগুলো তুলে আনলেন। মাওলানা রুমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন বইগুলোর একটি পাতাও ভিজে যায়নি।

মওলানা রুমি তার ভুল বুঝতে পারলেন, এবং স্বীয় ভুলের জন্য বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। সাধক শামস্ তাব্রীজ তখন হাকীম সানাই এর একটি কবিতার চরন উদ্ধৃত করলেন-

যে জ্ঞান মানুষকে বিনযী না করে, অহংকারী করে; সে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে মূর্খ্য থাকাই শ্রেয়।

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (র.) জন্ম ১২০৭ খ্রিস্টাব্দ এর ১৭ই ডিসেম্বর তাজাকিস্তানের কোন এক অঞ্চলে। মৃত্যু ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কে। তাঁর বাবার নাম বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ। মায়ের নাম মুমিনা খাতুন।

১২১৫-১২২০ সালের মধ্যে তিনি বাগদাদ, দামেস্ক ভ্রমন করেন। পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করেন। এবং এরপর তুরস্কের পশ্চিম অঞ্চলের কোনিয়াতে স্থায়ী হন। তাঁর বয়স চব্বিশ হওয়া আগেই একজন কেতাবী পন্ডিত হিসাবে খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর পীর এর সাথে দেখা হওয়ার পর তিনি গজল লেখায় অনুপ্রাণিত হন এবং প্রায় দশ বছরের মধ্যেই লেখেন দিওয়ান-ই-শামস্ তাব্রীজ।

জীবনের শেষ দিকে তিনি তুরস্কের আনাতোলিয়ায় চলে আসেন এবং এখানেই তাঁর অমর সৃষ্টি মসনবী রচনা করেন। মসনবী শব্দের অর্থ ‘Rhyming Couplet’ অর্থাৎ দুই লাইনের ছন্দবদ্ধ কবিতা। ছয় খন্ডে সমাপ্ত হয় এই অমর গ্রন্থ।

ঐশ্বরিক প্রেম কী? এক আল্লাহর কাছে কোনো ইহকালিন এবং পরকালীন প্রাপ্তির আশা আকাঙ্খা না করে তার প্রতি বিশুদ্ধ নিয়তে একাকার হওয়ার নাম।

একখন্ড লোহার খন্ড থেকে কোনো ভাইে ছুরি-চাকু বানানো সম্ভব নয় যতক্ষন পর্যন্তনা তা কোনো দক্ষ কামারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেরকম আধ্যাত্মিক প্রেম অর্জনের জন্যও একজন প্রকৃত সাধক শিক্ষক এর কাছে যেতে হয। এই আধ্যাত্মিক প্রেমের কারণেই ইরানের বলখের শাসক ইব্রাহীম বলখী সিংহাসন ছেড়ে চটবস্ত্রে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন।

মওলানা রুমি বলেন-

“I was dead, yet became alive,
I was a tear yet became a smile,
I entered the ocean of love,
And reached the eternal happiness!”
ভাবার্থ: আমি মৃত ছিলাম তবুও সজীব হলাম, আমার অশ্রু হঠাৎ হাসিতে রূপান্তরিত হল। আমি ভালবাসার সাগরে ডুব দিলাম এবং চিরশান্তি পেলাম। তিনি আরও বলেন-

“Look, O disciple, at the beauty in the mirror!
But do not be deceived by the lie in it,
For the beauty of youth will fade,
And the solid structure will collapse”.

ভাবার্থ: হে তরুন শিক্ষার্থী। আয়নার দিকে তাকাও কিন্তু এর ভিতরের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইও না।এই তারুন্য এক সময় বিবর্ণ হয়ে যাবে এবং অবশ্যই বার্ধক্য প্রকাশিত হবে।

প্রকৃত সাধক জাগতিক সমস্ত পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকেন। পার্থিব চাওয়া পাওয়ার তিনি ঊর্ধ্বে। তার চরিত্র হয় নিষ্কলুষ। তিনি অন্যের উপারের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। মানুষের মঙ্গল করাই তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হয়।

আজকের এই ডিজিটাল যুগে পতন উন্মুখ তরুন সমাজ এর কাছে আধ্যাত্মিক প্রেম এক কল্পনাতীত বিষয়ের নাম। তাদের উচিৎ জীবনে একবার হলেও আল্লাহ প্রেমের স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করা। আতরের দোকানে গেলে সুগন্ধি কেনার সমর্থ না থাকলেও সুগন্ধির সুবাস নিতে তো অসুবিধা নেই।

তরুণদের উদ্দেশ্যে মাওলানা রুমি (রঃ) বলেন:

“Go to the graveyard
Sit there for a while in silence.
Listen to the voices of the mute!”

ভাবার্থ: কবর স্থানে গিয়ে কিছুক্ষন বসো; চেষ্টা করো মৃতদের কথা শোনার।

লেখকঃ শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, বি এন কলেজ ঢাকা।

All News

পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণRead More

ইচ্ছে

পরী