শিক্ষায় দার্শনিক প্রভাব

আলমগীর হোসেন খান

মানুষের প্রজ্ঞা প্রসূত দর্শন এবং শিক্ষা দর্শন সমাজে প্রচলিত শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। শিক্ষার মধ্যেই প্রতিষ্ঠীত হয়, মানুষের দর্শন ও দার্শনিক মতবাদ। প্রজ্ঞাধারীকে প্রজ্ঞা প্রসূত দর্শন এবং শিক্ষা দার্শনিক মতবাদগুলোর ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষাস্তর ভিত্তিক শিক্ষা ধারা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাক্রম, শিক্ষণীয় বিষয় বস্তু, শিক্ষক প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীর শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম, সহ শিক্ষাক্রমিক কার্যবলি এবং শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাও এর বাইরে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার অগ্রগতি ও প্রগতিশীলতা শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি ওতোপ্রতোভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।

দর্শন

দর্শন এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Philosophy যা দু’টি গ্রীক শব্দ Philos এবং Sophia হতে উদ্ভব হয়েছে। গ্রীক Philos অর্থ ভালবাসা অনুরাগ, প্রেরণা। আর Sophia শব্দের অর্থ হলো জ্ঞান, প্রজ্ঞা। অর্থাৎ Philosophy শব্দের অর্থ হলো জ্ঞানের প্রতি ভালবাসা, প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ কাজেই অর্থগত ভাবে বলা যায়, দর্শন হলো জ্ঞানের অনুরাগ বা সত্যের অনুসন্ধান। অর্থাৎ জ্ঞান বা সত্যের ক্রমাগত অনুসন্ধানকেই দর্শন বলে। আর যিনি জ্ঞান বা সত্যের অনুসন্ধান করেন তিনিই হলেন দার্শনিক।

“সত্যের সন্ধানের ক্রমাগত প্রচেষ্টাই হলো দর্শন”-সক্রেটিস

“শাশ্বত বাস্তব প্রয়োজনীয় প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের প্রচেষ্টাই দর্শন”-প্লেটো।

“দর্শন হলো জ্ঞান সম্পর্কীয় বিজ্ঞান এবং তার সমালোচনা”-কান্ট

পরিশেষে বলা যায় দর্শন হলো সমগ্র সত্বার প্রকাশ ও সত্যের আবিষ্কার যা প্রজ্ঞা নির্ভর।

শিক্ষাদর্শন

দর্শনের একটি প্রায়োগিক শাখা হলো শিক্ষাদর্শন। এর মধ্যমে শিক্ষা সম্পকির্ত সমস্যার সমাধান করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ দর্শন শাস্ত্রের যে শাখায় শুধুমাত্র শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও সমস্যার সমাধান করা হয় তাকেই শিক্ষাদর্শন বা Educational Philosophy বলা হয়। শিক্ষার উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে দার্শনিক মতবাদের প্রয়োগ ও নীতিমালার ব্যবহার নিয়ে শিক্ষাদর্শন আলোচনা করে।

শিক্ষা দর্শনের সম্পর্ক

শিক্ষা ও দর্শন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে বাস্তবমুখী কর্মকা-ের জন্য প্রস্তুত করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াই হলো শিক্ষা। আবার বাস্তবমুখী চেতনার বহিপ্রকাশ ঘটানো দর্শনের কাজ। সুতরাং শিক্ষা ও দর্শন এদের আন্ত:সম্পর্ক অতি নিবিড়। এরা পরস্পরের পরিপূরক। শিক্ষা ও দর্শনের সম্পর্ক নিচে কয়েকটি শিরোনামে বর্ণনা করা হলো:

জীবনের গতি নির্ধারণে: মানব জীবনের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করা দর্শন ও শিক্ষার কাজ। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে জনকল্যাণে তাকে নিবেদিত করা। যার মাধ্যমে ব্যক্তি এবং সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়। আধুনিক বাস্তবধর্মী শিক্ষার মাধ্যমে জীবনে যথার্থ গতি সৃষ্টি করা দর্শনের কাজ।

ব্যক্তি চেতনার উন্নয়নে: দর্শন ব্যক্তি চেতনাকে অনেক শানিত করে যার প্রভাব শিক্ষণ ও শিক্ষাক্ষেত্রে পড়ে। মানবীয় চেতনা যেদিকে প্রবাহিত হয় ব্যক্তির শিক্ষাও সেদিকে ধাবিত হয়। কাজেই ব্যক্তি, সমাজ, এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে ব্যক্তি চেতনার প্রয়োগে দর্শনের প্রভাব অনস্বীকার্য।

মুক্ত চিন্তার বিকাশ সাধন: দর্শন মানবের চিন্তার বিকাশ ঘটায়। আর শিক্ষা ব্যক্তির মুক্ত চিন্তাকে বাস্তব কর্মকান্ডে প্রয়োগ ঘটায়। কাজেই দর্শন এবং শিক্ষা উভয়েই মানবীয় উন্নয়ন পরমত সহিষ্ণুতা এবং জনকল্যাণে ব্যক্তিকে ব্রত করে।

সার্থক শিক্ষাক্রম প্রণয়নে: দর্শন মানব সমাজের জন্য কল্যাণকর শিক্ষার যথার্থ শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং শিক্ষণ-শিখনীয় বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে থাকে। আর শিক্ষা তার যথার্থ বাস্তবায়ন করে। কাজেই আদর্শ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উভয়ের ব্যাপক ভূমিকা আছে।

মূল্যবোধের বিকাশে: দর্শন হলো জীবনের মৌলিক মূল্যবোধের গবেষণাগার। আর শিক্ষা এ গবেষণাগার হতে প্রসূত বা কাক্সিক্ষত ফলাফলকে গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে গড়ে তোলে।

বিষয়বস্তুর সাদৃশ্যকরণে: দর্শন এবং শিক্ষা উভয়েরই শিক্ষণ-শিখন বিষয়বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। কারণ উভয়েই মানবীয় কল্যাণের বিষয়বস্তু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করে থাকে। দর্শন এবং শিক্ষা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করে থাকে। সে অনুযায়ী জীবনাদর্শ নির্ধারিত হয়ে থাকে।

শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি ও উপকরণ: দর্শন ব্যক্তি ও সমাজের শিক্ষার উন্নয়নে নিবেদিত। বিশেষ করে শিক্ষণÑশিখন কার্যক্রমে যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি প্রনয়ন ব্যবহারে দার্শনিক প্রভাব কাজে লাগে। পাশাপাশি শিক্ষার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ, ব্যবহার এবং সংরক্ষণে দর্শন ও দার্শনিক মতবাদ পাথেয় যোগায়।

মূল্যায়নে: শিক্ষা সংক্রান্ত কাজের ম্যল্যায়নে দর্শনের জ্ঞান অপরিহার্য। মূল্যায়ন যেহেতু উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয় সেজন্য তার ওপর ও দর্শনের প্রভাব রয়েছে। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পদ্ধতি ও উপকরণ নির্বাচনে শিক্ষাদর্শন পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং দর্শন এবং শিক্ষা পারস্পর নিবিড়ভাবে জড়িত।

ভাববাদ

ভাব জগতের অধীশ্বর হলেন সষ্ট্রা। ভাবের মধ্য দিয়ে স্রষ্টার উপলদ্ধি করা ভাববাদের মূলকথা। ভাব চিরন্তন, চিরসত্য, এবং অনন্ত। ভাবের মধ্য দিয়ে জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। জগতের সবকিছুই ভাব কেন্দ্রিক।

ভাববাদের ইংরেজি শব্দ হলো Idealism এটি গ্রীক শব্দ Ideas হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। যার অর্থ হলো ভাব। ভাবের কোনো বাহ্যবস্তুসত্তা নেই। ভাবের মধ্য দিয়ে জীবাত্মা ও পরমাত্মার উপলদ্ধি প্রকাশ পায়। ভাববাদ সম্পর্কে কতিপয় ভাববাদী দার্শনিকের অভিমত নিচে উপস্থাপন করা হলো।

“বাস্তব পৃথিবী সার্বজনীন ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ যা ভাবকেন্দ্রিক। ভাব চরম বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব।”— প্লেটো।

অতীন্দ্রিয় জগত চিরসত্য এবং চিরন্তন যা ভাব কেন্দ্রিক ভাবের মধ্য দিয়ে ইন্দ্রিয় এবং অতীন্দ্রিয় জগতের সম্পর্ক স্থাপিত হয়।”— কান্ট

পরিশেষে বলা যায়, একমাত্র পরমাত্মাই সত্য, অবিনশ্বর এবং অনন্ত। পরমাত্মার উপলব্ধি আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা নামে অনুধাবনীয়। ভাবের মাধ্যমেই পরমাত্মার উপলব্ধি অনুধাবন করা যায়। আর এ ভাবকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত মতবাদই হলো ভাববাদ, যা চিরসত্য।

আধুনিক ভাববাদী দার্শনিকগণ ভাববাদকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন: বিষয়ক ভাববাদ, বিমূর্তায়িত ভাববাদ এবং নৈর্ব্যক্তিক ভাববাদ ।

গ্রীক দার্শনিক অ্যানাবত্রী গোরাসের চিন্তাজগৎ হতে ভাববাদের উৎপত্তি ঘটে। তিনিই Philosophy শব্দের প্রবর্তক। অন্যদিকে প্লেটো ভাববাদের ওপর লিখিত বর্ণনা উপস্থাপন করেন তাই প্লেটোকে ভাববাদের জনক বলা হয়।

আধুনিক শিক্ষাবিদগণ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, শিক্ষাক্ষেত্রে ভাববাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ বিশ্বে ভাববাদী দর্শন কেন্দ্রিক শিক্ষার গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নির্ধারণ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষা মূল্যায়ন ভাববাদের অবদান অনস্বীকার্য।  বর্তমান বিশ্বের দ্বন্দ্ব সংঘাত বিক্ষুব্ধ পরিবেশে ভাববাদী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

বাস্তববাদ

বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তা ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে দর্শনের বাস্তুতান্ত্রিক চেতনায় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যে মতবাদ দাঁড় করানো হয়েছে তা হলো বাস্তববাদ। দার্শনিক মতবাদগুলোর মধ্যে বাস্তববাদ অনেকটা প্রগতিশীল এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন নির্ভর।

বাস্তববাদের ইংরেজি হলো Realism এটি ইংরেজি Reality কে কেন্দ্র করে সাম্প্রসারিত হয়েছে। বস্তুর বাস্তবতা বস্তুর স্বাধীন অস্তিত্বকে পরিপূর্ণভাবে স্বীকার করে নিয়েই দর্শন জগতে এ বাস্তববাদের জন্ম হয়েছে। বাস্তববাদ মূলত জ্ঞান নিরপেক্ষ বস্তুর স্বাতন্ত্র বাহ্য সত্তা স্বীকার করেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বাস্তববাদ সম্পর্কিত কতিপয় দার্শনিকগণের অভিমত নিচে উপস্থাপন করা হলো:

“জগতের প্রত্যেকটি বস্তু কোনো না কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি যাদের নির্দ্দিষ্ট আকার আকৃতি রয়েছে এবং বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এদের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়।”-এরিস্টটল।

“বাস্তবে যা কিছু প্রয়োগযোগ্য তার নিরিখেই ব্যক্তি বা বস্তুর গুরুত্ব বিবে”্য এখানে বাস্তবতার বাইরে কোনো কিছুর স্থান নেই।”উইলিয়াম ড্রাম স্ট্যাল্ড।

যেকোন কিছুর বাস্তবতার নিরিখে ব্যবহারিক গুরুত্ব ভিত্তিক দার্শনিক মতবাদ বা দর্শন নির্ভর তত্ত্বকেই বাস্তববাদ বলা হয়। বাস্তবতার পেক্ষাপটে শিক্ষার উন্নয়নে এর অবদান অনস্বীকার্য।

রেঁনেসার যুগে পরবর্তীতে আধুনিক শিক্ষাবিদ এবং দার্শনিকগণ বাস্তবাদের ভাবধারাকে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেন। যেমন: মানবতাধর্মী বাস্তববাদ, সামাজিক বাস্তববাদ এবং ইন্দ্রিয় বাস্তববাদ

যান্ত্রিক সভ্যতার চূড়ান্ত বিজয় পর্বে এসে শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তববাদের অবদানকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মানবীয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করার ক্ষেত্রে বাস্তববাদের অপরিসীম অবদান রয়েছে। এ মতবাদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে করেছে প্রগতিশীল।

আধুনিক বিশ্বে বাস্তববাদ এর চরম উৎকর্ষ ম্লান হয়ে গেলেও তার ব্যবহারিক গুরুত্ব একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় নি। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে এ মতবাদের সার্বজনীন অনুসরণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো বেশি প্রগতিশীল এবং সমৃদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কারণ বাস্তববাদের চেতনা মানুষকে অনেক বেশি বিজ্ঞানমনস্ক করেছে।

প্রয়োগবাদ

দর্শন জগতের ভাববাদ, জড়বাদ এবং বাস্তববাদের ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রয়োগবাদের জন্ম হয়েছে। এটি হলো অভিজ্ঞতা কেন্দ্রিক দার্শনিক মতবাদ। প্রয়োগবাদ মূলত ভাববাদ ও প্রকৃতিবাদের মধ্যবর্তী একটি প্রগতিশীল দার্শনিক মতবাদ।

প্রয়োগবাদের ইংরেজি শব্দ হলো Pragmatism এটি গ্রীক শব্দ Pragma হতে উৎপত্তি লাভ করেছে যার আভিধানিক অর্থ হলো কার্যক্ষমতা বা উপযোগিতা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Utility যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ দাঁড়ায় ব্যবহার উপযোগী। কাজেই অর্থগতভাবে বলা যায়, আমাদের ব্যবহার উপযোগিতার মাধ্যমে কার্য অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিধিবদ্ধ সত্যে উপনীত হয়ে যে মতাদর্শ গড়ে উঠেছে তাই হলো প্রয়োগবাদ।

প্রয়োগবাদ সম্পর্কে কয়েকজন দার্শনিক শিক্ষাবিদের অভিমত নিচে উপস্থাপন করা হলো:

“দুনিয়াতে অপরিবর্তিত বলে কিছু নেই; একমাত্র পরিবর্তনশীলতার শাশ্বত সত্যের সাক্ষ্য বহন করে।” — হিরাক্লিটাস।

“মানুষই সত্যের যাচাইকারী এটি পরিবর্তনশীল, সবার উপর মানুষের কার্যই চিরসত্যা।” — মিলার

বিশ্বের বিভিন্ন প্রয়োগবাদী দার্শনিকদের মধ্যে চালর্স, পিয়ার্স, উইলিয়াম জেমস্, ফ্রামিসবেকন, মিলার প্রমুখ অন্যতম।

-প্রয়োগবাদের মূল দর্শন হলো যা কাজে লাগে তাই হলো প্রয়োগসিদ্ধ সত্য।

-প্রয়োগসিদ্ধ সত্যের বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই

-কার্য অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রয়োগসিদ্ধ সত্যের উপযোগিতা যাচাই করা যাবে।

-মানুষ প্রাথমিকভাবে জৈবিক এবং পরে সামাজিক সত্ত্বা।

-উপযোগিতাই প্রয়োগবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

আধুনিক শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারের ক্ষেত্রে প্রয়োগবাদ অতি নিবিড়ভাবে জড়িত। প্রয়োগবাদের মতে শিক্ষা হবে ক্রমবিকাশমান অভিজ্ঞতা ও জীবনকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া। যার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। বাস্তব সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এটাই হলো প্রয়োগবাদের আসল ও মৌলিক উদ্দেশ্য। শিক্ষার লক্ষ্য হবে জীবনের সার্থক অভিযোজন যা বাস্তবকেন্দ্রিক।

আধুনিক শিক্ষার প্রসারে প্রয়োগবাদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রয়োগবাদ বিজ্ঞান ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। যা আধুনিক শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য হাসিলে সক্ষম হয়েছে।

প্রকৃতিবাদ

দার্শনিক মতবাদগুলোর মধ্যে প্রকৃতিবাদ অন্যতম। প্রকৃতিবাদ ভাববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণত প্রকৃতি তথা বিশ্ব প্রকৃতির স্বাভাবিক রীতিনীতি নিয়মকানুন এবং অবস্থানগত বিবর্তনকে কেন্দ্র করেই প্রকৃতিবাদের জন্ম হয়েছে। রুশোর শিক্ষামূলক সংস্কার মতবাদকে প্রকৃতিবাদ হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রকৃতিবাদের ইংরেজি শব্দ হলো Naturalism এটি ইংরেজি Nature কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার বাংলা অর্থ হলো প্রকৃতি। কাজেই অর্থগতভাবে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে যে দার্শনিক মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে তাকেই প্রকৃতিবাদ বলা হয়। প্রকৃতিবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে এ বিশ্ব জগতের দৃশ্যমান প্রকৃতি। যার বাইরে কোনো কিছুর আস্তীত্ব প্রকৃতিবাদীরা বিশ্বাস করে না।

প্রকৃতিবাদ সম্পর্কে কতিপয় প্রকৃতিবাদী দার্শনিকদের অভিমত নিচে উপস্থাপন করা হলো:
“প্রকৃতিই হচ্ছে আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য এবং প্রকৃতিগত শিক্ষাই সুন্দর, পবিত্র এবং বিশ্বস্ত যা প্রকৃতির কাছ হতেই প্রাপ্ত হয়।”-রুশো।

“শিক্ষার কোনো পাঠ্যক্রম নেই, প্রকৃতিগত বিবর্তনই শিক্ষার্থীর শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর পুনর্বিন্যাস করে।”-ডারউইন

প্রকৃতিবাদের মূল প্রবক্তা হলেন এরিস্টটল, সক্রেটিস, এপিকিউরাস, জ্যাঁ জ্যাক রুশো, ডারউইন, রবীন্দ্রনাখ প্রমুখ।

প্রকৃতিবাদের মূল বিষয় হলো বিশ্ব প্রকৃতি। মূলত প্রকৃতিবাদের জন্মই হয়েছে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে।

-প্রকৃতিবাদের মৌলিক বিষয়বস্তু হলো এ বিশ্ব প্রকৃতি, যার বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।

-বিশ্ব প্রকৃতি হতে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান আহরণ করা হয়।

-প্রকৃতিগত শৃঙ্খলাই হলো চিরন্তন যাতে কৃত্রিম শৃঙ্খলার কোনো অবকাশ নেই।

-প্রকৃতিগত শিক্ষাই হলো চিরন্তন, সুন্দর ও পবিত্র।

-শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস হবে প্রকৃতি প্রদত্ত।

আধুনিক শিক্ষার উন্নয়ন অগ্রগতিতে প্রকৃতিবাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। প্রকৃতিবাদের মৌলিক বিষয়বস্তু হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি কেন্দ্রিক ধারণা হতেই শিশুর শিক্ষা, শিক্ষাক্রম, শিক্ষণ সামগ্রী হবে প্রকৃতি নির্ভর।

-বিশ্ব প্রকৃতিই হবে শিক্ষার্থীর শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু।

-শিশুর অভিজ্ঞতা হবে প্রকৃতিকেন্দ্রিক স্বতঃস্ফূর্ত।

-প্রকৃতিবাদের দৃষ্টিতে শিক্ষক হবেন দর্শক ও পর্যবেক্ষক।

-ব্যক্তি কেন্দ্রিকতার নীতি অনুযায়ী শিক্ষণ হবে।

-প্রকৃতিবাদ অনুযায়ী শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে তার নিজস্ব ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী।

সুতরাং বলা যায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃতিবাদের অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক শিক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক মৌলিক নীতি এবং কর্মকেন্দ্রিক পেশাগত শিক্ষার উন্নয়নে প্রকৃতিবাদ বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছে।

উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন পরিবর্ধন সাধিত হয়। মানবীয় জীবন যাপনে আধুনিকতা সংযোজিত হয়েছে। ভাবকেন্দ্রিক শিক্ষা চেতনা প্রতিহত করে বাস্তবভিত্তিক চেতনাকে অনেক বড় করে দেখা হয়। বাস্তবতা নির্ভর শিক্ষার আধুনিকতার কাঠামো দাঁড় করানো হয়। শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তির মধ্যে ভাববাদ, প্রয়োগবাদ ও প্রকৃতিবাদ এর অবদানকে শিক্ষায় অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দর্শনকে সকল জ্ঞানের জননী বলা হয়।

All News

পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণRead More

ইচ্ছে

পরী