পরী

মোঃ তারিকুল ইসলাম

-অর্ক, কি খবর? কাজ কতদূর?-
-এইতো ভাইয়া, প্রায় শেষ… .. ভাইয়া এই যে। এটার পারপোরেশনের এই অবস্থা- অর্ক বললো।
(পারপোরেশন হল সিনেমার ফিতার দুই পাশের ছোট ছোট ছিদ্র। অর্ক মুভি এডিটিং করে। পাশাপাশি গ্রাফিক্স, আ্যনিমেশনও ভালো করে। এই দিয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি নিজের পকেট খরচ চালিয়ে নেয়।)
আরে! দারুনতো?- আমি মেশিনে অনেক চেষ্টা করেও এতো সুন্দর করে পারপোরেশন বের করতে পারিনি, কয়টা ইফেক্ট দিলা? – ভাইয়া (অফিসের বস) বললো।
-এইতো ভাইয়া দুইটা কার্ড নিয়েছি। একটি ব্যবহার করেছি ব্ল্যাক করে দিতে আর অন্যটা কালার ব্যালেন্স করতে।- আমি বললাম। (ডেডলাইন চলে এসেছে বলে, বাসায় বসেও কাজ করতে হচ্ছে।)
“ফাটিয়ে দিয়েছো। দারুন কনভার্ট, জটিল হয়েছে, এসো চা খাও।” -ভাইয়া বললো।
“থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া, আমি আসলে মনযোগ দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
“হুম, ভালো, ভালো। আবার এডিটিং এর সময় শুধু নায়িকার দিকে তাকিয়ে থেকনা। হা হা হা।”
“ভাইয়া যে কি বলেন…! হাহা-”, অর্কও একটু হেসে নিল।
-ভাইয়া ভেতর থেকে কাউকে ডাকলেন, “পরী- আমাদের চা দাওতো আপুনি।”
-“দিচ্ছি ভাইয়া-” মিষ্টি গলায় উত্তর এল। একটু বেশিই মিষ্টি মনে হল।
কিছুক্ষন পরে যখন ভেতর থেকে পরী ‘চা’ নিয়ে আসলো, মনে হলো কেমন যেন একটা মিষ্টি বাতাস এসে মুখে লাগলো। সেই বাতাসে সবকিছুই ওলট-পালট হয়ে গেল। মনে হলো চারিদিক থমকে গেল। কিছুই যেন নড়ছেনা।
হঠাৎ একটি আওয়াজ ভেসে এল, কই গেলে—– চা নাও, —– ও ভাইয়া…
চায়ে চুমুক দিয়ে মনে হলো, এমন চা সে আগে কখনই খায়নি।
একটু জোরেই বলে ফেললাম, – ভাইয়া ‘চা’ দারুন হয়েছে।
– মানে কি, তুমি কি চিনি ছাড়া চা খাও?
-কেন ভাইয়া?
-তুমি তো চায়ে চিনি নাওনি।
-ও আমি আসলে চিনি ছাড়াই চা খাই।
পাশেই রান্না ঘর ওখান থেকে পরী সবই শুনলো আর হাসলো। পরীর মনে হলো, এই রকম বোকা ছেলে আর কখনই সে দেখেনি। যাহোক, আমিতো ছিলাম আকাশে কিন্তু যখন চায়ের দ্বিতীয় চুমুক তেতো লাগা শুরু হলো তখনই মনে হলো আমি আসলেইতো খাচ্ছি চিনি ছাড়া র’ চা…!
-‘হা হা… এতটা বুদ হইয়ো না। কাজকে আবেগ নয়, পেশাদারিত্ব ‍দিয়ে বিবেচনা কর।’-ভাইয়ার পরামর্শ।
আবার কাজ করা শুরু করলাম। কাজ আর কাজ। সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম যে জায়গায় দুটো ‘বিল’ কনভার্ট করার কথা সেই জায়গায় তিনটা করার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হচ্ছে যেই ভাবে হোক ১৬ টি রিল কনভার্ট করতে পারলেই আমি বাঁচি। কারণ ১টি ছবি তৈরি হতে লাগে ১৬টি রিল এবং এগুলোকে কনভার্ট করতে সময় লাগে প্রায় তিনদিন। কাজ করতে করতে রাত ১২:৫০ মিনিট। অনেক কষ্টের পরে বিকেল থেকে এই পর্যন্ত ১টি মাত্র রিল কনভার্ট করতে পারলাম। যাই হোক রাতের খাবার খেতে বসে, আবার সেই ভালোলাগা। মুখ উপরে না তুলেই খাবার শেষ করার চেষ্টা করছি।
ভাইয়া বললো, তোমার কি লাগবে, মাছ দিবো? – ডাল নাও, না। বললাম, ঠিক আছে ভাইয়া। একটু পরেই ভাইয়ার একটা ফোন আসলো— ভাইয়া ডাইনিং ছেড়ে উঠে ফোন রিসিভ করতে গেল। আমি আরো লজ্জা পেয়ে গেলাম। পরী বললো, একটু ভাত দেই…?
আমি কিছুই বলতে পারলাম না—- সে ভাত দিল, মাছ দিল, সাথে একটু আচারও দিল। পরী বললো, এখন একটু খেতে ভালো লাগবে, খেয়ে ফেলেন। সত্যিই এতো ভালো আর কখনোই লাগেনি। খাবার শেষ করে আমিই কাজ শুরু করে দিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে দ্বিতীয় রিল এর কাজ শেষ হলো। এখন সময় ভোর ৫:০৮ মি.। ভাইয়া বললো, থেকে যাও। আমি বললাম অফিসে গেলে ভালো লাগবে-তো ভাইয়া? গাড়ি চালককে আগে থেকেই বলে রেখেছিল যে, রাতে বাইরে যেতে। আমিও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ড্রাইভার বললো, মামা আপনি কি কিছু খুঁজছেন?। হঠাৎ লাফিয়ে উঠলাম, বললাম- না, এমনিতেই—— আসলে আমার ডান কাঁধে ব্যাথা মনে হচ্ছে। চালক হেসে বললো, মন দিয়ে খুঁজেন মামা পেয়ে যাবেন।
তার কথা শুনে মনে হলো সে আসলে অন্যকিছু বুঝাতে চাইছে। সময় ভালো হলে হরিনও বাঘের নাকে সুড়সুড়ি দেয়! তখন কিছু করার থাকে না। অফিসে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে শুয়ে পড়লাম এবং ড্রাইভার গেল প্রোডাকশন বয় এর সাথে গল্প করতে। অফিস বলে কথা, নিচে কার্পেট এবং মাথার নিচে ফোম। শুধুই পরী, চারিদিকে পরী। জেগে থাকলে তো দেখিই; ঘুমানোর চেষ্টা করলে আরো বেশি দেখি।
দুই ঘন্টা বিশ্রাম নেওয়ার পরে টেলিভিশন দেখতে বসলাম ভালো লাগেনা। একটু পরে সকালের নাস্তা নিয়ে আসলো। খেয়ে আমরা রওনা দিলাম। যেতে যেতে আবার সেই গান ‘পরী’। চারিদিকে এতো পরী, তবুও শান্তি কোথাও মিলেনা।
পরীর বাসার কলিংবেলে চাপ দেবার সাথে সাথেই সে দরজা খুললো। মনে হলো সে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে এমন করে হাসি দিল মনে হলো তার হাসির সাথে আমার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে গেল। আমাকে সে চোখ দিয়ে ইশারায় বুঝালো, কেমন আছেন? আমিও বললাম ভালো, তুমি ক্যামন?
বলল, ভালো। ভাইয়া ভিতরের রুম থেকে জিজ্ঞেস করলো, কে এসেছে আপুনি!
পরী বললো “ভাইয়া, কালকের উনি”। সাথে সাথে সে সরে গেল, আমি ঢুকে পড়লাম। প্রথমদিন কাজ কম হয়েছে সেই অর্থে আজ কাজের প্রচুর চাপ আর মানুষ ছিলাম মাত্র দুইজন। কাজ করতে ভালোই লাগছিল। প্রায় রাত দুইটার দিকে কাজ বন্ধ করে ঠিক তখনই আমরা ভারি ভাবার খাই এবং কাজ শেষ করি রাত চারটার পর। আল্লাহর রহমতে কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। মাত্র দুইটি রিল বাকি ছিল। অবশ্য গত সন্ধ্যায় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমি কাজ করছিলাম উত্তর-দক্ষিণ দিকে মুখ করে এবং দরজা হলো পশ্চিম দিক বরাবর। আমি এখান থেকে ওর চেহারা দেখতে পাচ্ছিলাম না শুধু পা ছাড়া। দাঁড়ালাম চেহারা দেখার জন্য। একটু একটু করে পেছনে আসতেই তার চেহারার একটু অংশ দেখতে পেলাম। আর একটু পেছনে সরতেই তাকে দেখতে পেলাম। ক্ষনিকের মধ্যে চোখে চোখ হয়ে গেল, অনেক কথা। হঠাৎ মনে হলো, ভাইয়া পেছন দিকে ফিরতে পারে। এই ভেবে তারাতারি বসতে গিয়ে পায় লেগে চায়ের কেটলিটা ভেঙ্গে গেল। ভয় পেয়ে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে পরী হাসতে হাসতে শেষ। ভাইয়া এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিলো এবং বললো, মানুষের পেছনে কি চোখ আছে যে!
দেখবে পেছনে কি আছে? যাও চোখ মুখে পানি দিয়ে আসো।
তৃতীয় দিন কলিং বেল দিতেই আবার সেই মায়াবী হাসি এবং কোথায় যেন একটু চিন্তার ছাপ। ভিতরে ঢুকলাম এবং কাজও শুরু করলাম। দুপুর তিনটে নাগাদ কাজ শেষ। যাক, ফাইনালি কাজটা নিখুত ভাবে শেষ হল।
চলে আসবো কিন্তু তাকে তো একটুও দেখতে পেলাম না। মনটা যেন কেমন করছে। হঠাৎ দেখলাম তড়িঘড়ি করে ভেতর থেকে এল; ভাইয়ার পাশেেএসে দাড়ালো। আমি চলে যেতেই ভাইয়া বললো, “ভাংতি টাকা আছে?”
আমি বললাম, “আছে, লাগবেনা”।
ভাইয়া বললো, তবুও নিয়ে যাও, এই বলে গোসল করতে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। পরী হেটে এসে চুপি চুপি বললো, এই যে নেন। দুই হাত থেকে দুইটা ১০০ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললো তাড়াতাড়ি যান।
আমি বললাম, “উনি ১০০ দিতে বললো আর তুমি ২০০ দিলে যে?”
ভাইয়া এখানে থাকলে ডান হাতেরটা দিতাম। ভাইয়া নেই, তাই দুটোই দিলাম। আর ডান হাতেরটায় আমার ফোন নাম্বার আছে। সময় করে অবশ্যই ম্যাসেজ দিবেন।
আমি এক সিঁড়ি নামতেই সে বললো, “হাদারাম!”
আমি পেছনে ফিরতেই চোখাচোখি, হৃদয় উজার করা মিষ্টি হাসি । দরজা লাগিয়ে দিলে আমিও চলে আসি। ক্লান্ত থাকায় সেদিনই আর ম্যাসেজ দেইনি। নোট দুটোও আর খরচ করিনি। রেখে দিয়েছি, ভাল লাগার প্রথম চিহ্ন হিসেবে।
পরদিন অফিসে ভাইয়া ডেকে পাঠালেন। বললেন, “আজকেও বাসায় যেতে হবে। অল্প একটু ফিনিশিং দিতে হবে।” খুশিতে আমি আটখানা। আজও দেখা হবে পরীর সাথে।
বিকেলে ভাইয়ার গাড়ীতে করে ভাইয়ার বাসায়। ভাইয়া খুব প্রফেশনাল। মন দিয়ে কাজ করেন। সিনেমা পাড়ায় তার বেশ সুনাম আছে। তাই বাসায়ও একটা এডিটিং স্টুডিও করে নিয়েছেন। বাসায় ঢুকেই ভাইয়া নিজেই কফি বানিয়ে আনলেন। কাজ করলাম একটানা প্রায় দু’ঘন্টা। সন্ধ্যা পেড়িয়ে গেলেও পরীর দেখা পেলাম না। কাজ শেষে ভাইয়া ফ্রিজ থেকে কাঁচা আমের জুস বের করে দিলেন। বেশ টেষ্টি। রাতেও ভাইয়া খাবার পরিবেশন করলেন। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। পরীকে না দেখে আর ভালোই লাগছিল না।
হঠাৎ লাজ-লজ্জা ভুলে জিজ্ঞেস করে বসলাম, “ভাইয়া, আজকে পরীকে দেখছিনা…!”
ভাইয়া অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।
হাহাহাহ হাহাহা হাহা… … ….
আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই বললেন, “অর্ক, তুমি আসলেই এডিটিং খুব ভালো কর। এই লাইনে তোমার ভালো করার সম্ভাবনা আছে।”
তখনও ঘোর কাটেনি আমার। বুক পাজরে কেমন যেন বিচিত্র একটা মোচড় দিল। চোখ ছলছল করে উঠল।
-“ভাইয়া আসি…” (ভারী হয়ে এসেছে অর্কের কন্ঠ। স্ক্রীণ কতটা প্রবল হতে পারে ভাবছে অর্ক। তাহলে সবই কি…! আর ভাবতে পারছে না সে। প্রতিটি বাক্যে বিদ্যুৎ বেগে জল গড়িয়ে আসছে চোখ থেকে।)
পরী এখন সুপারস্টার, হার্টথ্রুব অভিনেত্রী। অর্ক সেদিন থেকে এডিটিং এর কাজ বাদ দিয়ে দেয়। অর্ক এখন স্কুল টিচার। ভাইয়ার শত অনুরোধেও আর ফিরে যায়নি এডিটিং প্যানেলে। পরীকেও পাওয়া আর সম্ভব হয়নি। একদিন সেই ১০০ টাকার নোট দু’টো খুলে দেখলো অর্ক। একটিতে পরীর নাম্বার লিখা আছে সত্যই। ভাইয়া হয়তো কাগজ না পেয়ে টাকার উপরই কখনো নাম্বার টা লিখেছিলেন। 🙁
কিন্তু এখন আর পরীকে পাওয়া সম্ভব না।

লেখকঃ সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি), রাজধানী আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ, ঢাকা

All News

পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণRead More

ইচ্ছে

পরী