‘বিশ্বাস’

আসাদ খান

“বিশ্বাস আর আশা যার নাই, যেওনা তাহার কাছে
নড়াচড়া করে, তবুও সে মরা, জ্যান্ত সে মরিয়াছে।
শয়তান তারে শেষ করিয়াছে, ঈমান লয়েছে কেড়ে,
পরাণ গিয়েছে মৃত্যুপুরীতে, ভয়ে তার দেহ ছেড়ে।”
-কাজী নজরুল ইসলাম

বিশ্বাস আবার কি? বিশ্বাসতো বিশ্বাসই। না; বিশ্বাস হল ‘ফানা’। অর্থাৎ যাকে বিশ্বাস করব তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। নিজেকে তার মাঝে বিলীন করে দেয়ার নামই বিশ্বাস। তবে অন্ধ বিশ্বাস বিপত্তি ডেকে আনে। যারা বিশ্বাসের তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ জানে না তারাই বিশ্বাস শব্দটার মর্যাদা নষ্ট করে দিয়েছে। আমার এবারের আলোচনার বিষয় মহা পবিত্র এই ‘বিশ্বাস’।
‘‘যারা বিশ্বাসী এবং তাদের সন্তানেরা বিশ্বাস সহ তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের সন্তানের সাথে মিলিত করে দেব এবং কৃতকর্ম কিছু মাত্রও হ্রাস করবো না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী। আমি তাদেরকে ফলমূল ও গোশত দ্বারা সাহায্য করব যা তারা চাইবে। সেখানে তারা একে অপরকে পান পাত্র দেবে যেখানে নেই কোন অসার বকাবকি; এবং পাপ কর্মও নেই।’’ [সূরাঃ আত-তূর, ২১-২৩]
আমরা কেউ কেউ বিশ্বাসী। আবার কেউ কেউ পথভ্রষ্ট হয়ে বিশ্বাসীদেরকেই উল্টো বিপথে নেয়ার চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন, ‘অতএব আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার প্রতিশ্রুতি সত্য। যারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না তারা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে।’ [সূরাঃ রূম, আয়াতঃ৬০]। তার মানে বিশ্বাসীদেরকে সাবধান থাকতে হবে যাতে অবিশ্বাসীরা তাদের বিশ্বাসকে ভেঙে না দিতে পারে।
বিশ্বাস দিয়ে কি হয়? উত্তর- ‘সবকিছু’। তবে সেটা কোন বিশ্বাস- যে বিশ্বাস দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়?
একটি ছোট্ট গল্প বলি।
একবার এক মৌলভী সাহেব নদীর ধারে অযু করছিলেন। তিনি অযু শুরু করতে না করতেই তার মাদ্রাসার এক ছাত্র সেখানে আসল। ছাত্রটির মনে অনেক প্রশ্ন। নদীর ওপারে কি? পানিতে মাছ কিভাবে থাকে? নৌকা কিভাবে পানিতে ভাসে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন করে অস্থির। এমন সময় একটি হাঁসের ছানা কোথা থেকে এসে পানিতে নেমে নদীর ওপারে চলে গেল। ব্যাস, আর থামায় কে?
“হুজুর হাঁস পানিতে হাটে কেমনে? এত বড় নদী- একা একা ওই পাড়ে গেল কেন? যদি হারিয়ে যায় তবে ওর মা অনেক কাঁদবে।” মৌলভী সাহেবতো মহা বিরক্ত।
রেগে মেগে বললেন, “তাহলে চল, আমরাও হাঁসের মত ওপাড়ে গিয়ে দেখে আসি হাঁসটা ওই পাড়ে কি করতে গেল-!!!”
ছাত্রটিতো মহা খুশি। “চলেন ! চলেন !”
হুজুর বললেন, “তুই আগে যা-”
এক কদম দিতেই বালক টি বলল, “হুজুর, পানিতে পা ডুবে যায়তো।”
হুজুর ভাবলেন বেটাকে একটা শিক্ষা না দিলেই নয়। বললেন, “ওওও তোর পা ডুবে যাচ্ছে…? তাহলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানিতে ফু দিয়ে চোখ বন্ধ করে হাটা শুরু কর।” এই বলে হুজুর অযু শুরু করলেন।
বালকটি বিশ্বাস করে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানিতে ফু দিয়ে চোখ বন্ধ করে হাটা শুরু করল। কি আশ্বর্য! বালকটি সত্য সত্যই পানির ওপর দিয়ে হেটে ওপাড়ে চলে গেল।
বালকটি চিৎকার করে হুজুরকে ডেকে বলল, “হুজুর, এবার আপনি আসে-ন।”
হুজুর ভাবলেন এ আর এমন কি- আমিই শিখালাম; আর আমিই যাবোনা। তাই কি হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানিতে ফু দিয়ে যেই না পানিতে পা দিয়েছেন অমনি ধপাস করে পানিতে পড়ে গেলেন।
এই গল্পের শিক্ষণীয়ও কিন্তু সেই বিশ্বাস। ছোট্ট বালক তার বিশ্বাসের বলেই নদীর ওপর হেটে পাড় হয়ে গেল। অথচ মৌলভী সাহেব, এত জানাশুনা লোক হয়েও শুধু বিশ্বাসের অভাবে পানিতে পড়ে গেলেন।
বিশ্বাস বিভিন্ন রকম হতে পারে। প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে বিশ্বাস, বন্ধুর সাথে বন্ধুর বিশ্বাস, ব্যবসায়িক খাতিরে বিশ্বাস ইত্যাদি। কিন্তু আসল বিশ্বাসটা কি? সর্ব সত্য হচ্ছে “আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস” বা ‘আত্মবিশ্বাস’। মোটেও কোন ধর্মতত্ত্ব দিচ্ছিনা। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর উপর আপনার বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাসের ঘাটতি থাকবে ততক্ষণ আপনি সফলতা লাভ করতে পারবেন না। আপনার আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবেনা। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা আবশ্যক। আর ঐ লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য আত্মবিশ্বাসের বিকল্প নেই। যে কোন মানুষই তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারেনা। এর কারণ হীনমন্যতা, ভয় আর সর্বোপরি ‘অবিশ্বাস’। আল্লাহর উপর যারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই তাদের লক্ষ্যে পৌছে দেন।
আধুনিক জগতে বিশ্বাসের ধারণাটা নেই বললেই চলে। যতই প্রেমের কথা বলি মানুষ বিশ্বাস করতেই চায়না। অলৌকিক কিছু করে দেখালেই একদম ‘বাবা’ বলে তার পায়ে পড়ে। অথচ কোন ‘সত্য মানুষ’ ‘সত্য’ নিয়ে সামনে আসলে তাকে মূল্যই দিতে চায় না।
ইসলাম এর শাব্দিক অর্থ শান্তি। তবে এর তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ হচ্ছে, “কারো ক্ষতি না করা”। ইসলাম যে মানে, সে মুসলমান তবে নামমাত্র মুসলমান। আর ইসলাম যারা বোঝে, যারা উপলব্ধি করে তারাই প্রকৃত মুসলমান। মুসলমান হতে হলে, প্রথমেই চাই ঈমান যার অর্থ বিশ্বাস। আর, যে ঈমান আনে সে মু’মিন, মানে বিশ্বাসী। শান্তি উচ্চারণ করলেই শান্তি অসেনা। তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনার প্রয়োজন হয়। সর্বোপরি মহান আল্লাহ যেরূপে প্রকাশ পান তাঁকে চিনে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। এই জন্য আল্লাহর বন্ধুদের অনুসরণ ব্যাতীত আর কোন উপায় নাই। তবে সত্য ‘মানুষ’ চিনে নেওয়া আবশ্যক। কুরআন, সুন্নাহ সহ যার কাছে সত্য প্রেম ও প্রজ্ঞা পাওয়া যায় তাকেই কেবলমাত্র গ্রহণ করা উচিত।
আপনি যখনি আপনার ‘সত্যজন’ চিনে নেবেন, তাঁর কথায় সকল প্রকার লোভ, হিংসা, মদ ও মাৎসর্য্য ত্যাগ করবেন তখনি একদল লোক আপনাকে তিরস্কার করবে। তাতে আপনি অবশ্যই বিচলিত হবেন না। কারণ আল্লাহ পাক আগেই বলেছেনঃ
“নিশ্চয়ই অপরাধীরা বিশ্বাসীদের নিয়ে হাসতো।”- [সূরাঃ মুতাফফিফীন, আয়াতঃ ২৯]।
তাই একজন সত্য মানুষকে বিশ্বাস করে, তাকে জীবনের গাইড বা শিক্ষক মেনে জীবনকে সুন্দর পথে পরিচালনা করাই সৌভাগ্য। কারণ কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস ই আমাদের একমাত্র সম্বল। সেদিন বিশ্বাসীদের আল্লাহ পাক মহা সম্মান দান করবেন। পরবর্তী সংখ্যায় বিশ্বাস সম্পর্কে আমরা আরো বিস্তারিত জানবো। একটি কুরআনের আয়াত দিয়ে শেষ করছি।
“আগের ও পরের সকল নির্দেশই আল্লাহ তাআলার; সেদিন বিশ্বাসীগণ খুশি হবেন।”- [সূরাঃ রূম, আয়াতঃ ৪]।

লেখকঃ নির্বাহী সস্পাদক, হ্যালো-টন

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে