নীল বিদ্রোহ

এস. এম. আরিফ

প্রাচীন উদ্ভিদ তত্ত্ববিদদের মতে, নীল ছিল বন্য গাছ। এর আবাস ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে। তারপর চাষাবাদের মাধ্যমে নীল ব্যবহার শুরু হয়।
ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেখলো যে, ইংরেজদের নীলের জন্য ফরাসি ও স্পেনীয কলোনির উপর নির্ভর করতে হয, তাই তারা বাংলাদেশে নীল চাষের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহন করে। নীল চাষের ব্যবসাযিক লাভের উপর নজর পড়ল আরোও বেশি।
ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়, তারপর থেকে কলকারখানা দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে ইংল্যান্ডে বস্ত্র-শিল্পে অভূতপূব উন্নতি ঘটে এবং এই সকল কারনে বাংলাদেশের নীলের চাহিদা বাড়তে থাকে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশ হতে নীল সরবরাহ করার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ও বিহারে নীলের চাষ শুরু করে। কিন্তু প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করে বাংলাদেশের চাষিরা নীল চাষ করতে অস্বীকার জানায়। নীলকরেরা জোর=জুলুম ও আইনের অপপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়ে নীল চাষ করতে বাধ্য করে। চাষীরা দাদন ও আইনের মারপ্যাচে পরে ভূমিদাসে পরিনত হয়। বাংলার চাষীদের ক্রীতদাসে পরিনত করার হীন ষরযন্ত্র প্রথম থেকেই চলে আসছিল। আমেরিকায় প্ল্যানটেশনের জন্য আফ্রিকা খেকে নিগ্রো ক্রীতদাস কিনে এনে চাষের কাজে লাগনো হতো। ইংরেজ প্রভূরা এদেশে এসে মাত্র ২(দুই) টাকা দাদন দিয়ে এদেশীয় চাষীদের আজীবনের জন্য ক্রীতদাসে পরিনত করেছিল। মানুষকে এভাবে ক্রীতদাস করার জঘন্যতম উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।

নীলকরদের অত্যাচারের ফিরিস্তিতে প্রমানিত হয় যে তা কত জঘণ্য ছিল। –
-হিংসাত্বক আক্রমন ও নরহত্যা।
-অন্যায় অজুহাতে দেশীয় লোকদের অন্ধকার গুদামে আটক রাখা হত। খাদ্য হিসেবে দেয়া হত ধান। পানি পান করতে দেয়া হত না। নীল চাষে রাজী না হওয়া পর্যন্ত এভাবে আটক রাখা হত।
-তাদের গরু ছাগল আটক রাখা হত।
-ভারাটে গুন্ডা লাগিয়ে ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে ফেলা।
-চামড়া মোড়া বেত দ্বারা প্রহার করা ও আরোও অনেক জঘন্য পন্থায় শান্তি প্রদান করা।

অর্ধশতাব্দি পযন্ত চাষিদের উপর অত্যাচারের স্টীম রোলার সমান গতিতে চলতে থাকে।
নীরকরদের অত্যাচারের বিভীষিকায় বাংলার অসহায় কৃষকেরা দুঃসাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সারা বাংলায় সংগঠিত এ বিদ্রোহ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী ইংরেজ বেনিয়াদের শাসনের ভিত কাপিয়ে দেয়। নিরস্ত্র অসহায় বাংলার কৃষকরা, সুসজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে দুর্বার সংগ্রামে অসামান্য সাফল্য অর্জন করে তা মানব ইতিহসের নজিরবিহীন ঘটনা।

বাংলাদেশের সর্বত্র যখন নীল বিদ্রোহের চরম আকার ধারন করল, তখন বৃটিশ সরকার ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ১৮৬০ সালে ৩১ শে মার্চ ৫ সদস্য বিশিষ্ট্য নীল চাষের অবস্থা ও চাষীদের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার জন্য নীল কমিশন গঠন করে।
নীল করদের প্রতি প্রজাদের অভিযোগ:

  • তারা সেচ্ছায় নীল বপন করে না, যে সময় তারা নিজেদের লাভের কাজে নিযুক্ত থাকতে চায়, সে সময় তাদেরকে নীল বপনে বাধ্য করা হয়।
  • কুঠির লোক তাদেরকে সবচেয়ে ভাল জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য করে। এমনকি জমিতে অন্য কোন ফসল থাকলে তা নষ্ট করে ফেলে।
  • তারা বাধ্য হয়ে নীল করদের কাছে ঋনী হয়ে পরে। ফলে এ ঋন পুরুষাণুক্রমে চলতে থাকে।
  • কুঠির লোকেরা দাঙ্গা, গুম, কয়েদ, স্ত্রীলোকের প্রতি অত্যাচার প্রভৃতি আমনুষিক আচরন করে।

ম্যাজিস্টেটরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নীলকরদের সাহায্যকারী ও উপদেষ্টা ছিল। ম্যাজিস্টেটরা রায়তের প্রতি তাদের কর্তব্য পালনে তৎপর বা সচেতন ছিল না। রায়তরা যে পরিমান সহায়তা আশা করেছিল, তা তারা পায় নি। মোট কথা ম্যাজিস্টেটদের টান ছিল দেশিয় ইংরেজ নীলকরদের প্রতি। নীল কমিশনের বিরাট একটি প্রহসনের ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রজাদের কোন লাভ হয়নি। শুধু তারা এটাই উপলব্ধি করল যে, কাউকে দিয়ে তাদের কোন লাভ বা উপকার হবে না। তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই একমাত্র সম্বল। নীল কমিশনের রিপোর্টে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আস্থা রাখতে পারলনা স্বৈরাচার সরকারের প্রতি। নীল কমিশনের সমালোচনা করতে গিয়ে ১৮৬১ সালে জুন মাসে Calcutta Review লিখে “কোন সরকার যখন সর্বজনীনভাবে জনসাধারণের বিরাগভাজন হয়, তাতেই সাধারণ ভাবে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, গভঃমেন্ট হচ্ছে ত্রুটিপূর্ন। অন্যায় ও জনসাধারনের প্রয়োজনের অনুপযোগী… আমাদের গভঃমেন্ট বংশগত, যা বদলায় না এবং যার মধ্যে নতুন রক্ত সঞ্চালিত হয় না।”
নীলচাষ বিরোধী চাষীদের যারা উপদেশ, পরামর্শ ও অনুপ্রেরনা দিয়ে সংগ্রামমূখী কর তোলার কাজে সাহায্য করেছেন তাদের মধ্যে ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা শিশির কুমার ঘোষ, সাধুহাটির জমিদার মথুরানাথ আচায, চন্ডিপুরের জমিদার শ্রী হরি রায়, ‘হিন্দু প্যাট্রয়িট’ পত্রিকার সম্পাদক হরিশ চন্দ্র মূখার্জি ও নীল দর্পন নাটক প্রনেতা দীনবন্ধুমিত্র। প্রত্যক্ষভাবে যারা সংগ্রামের জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে মালদহের রফিক মন্ডল ও বগুড়ার কৃষ্নপ্রসাদ রায়, খুলনার রহিমউল্লাহ, ফরিদপুরের দুদুমিয়ার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
‘হিন্দু প্যাট্রয়িট’ পত্রিকার সম্পাদক হরিশ চন্দ্র মূখার্জি ছিলেন মধ্য শ্রেনীর এক মহৎ ব্যাক্তি। এক আর্শ্চয্যজনক ব্যাতিক্রম। তার উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের শতকরা ৯০ জন হিন্দু মুসুলমানদের উন্নতি বিধান এবং ভয়ংকর সংকট হভে তাদের উদ্ধার করা। হরিশচন্দ্রই একমাত্র নেতা যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধু মাত্র শিক্ষীত মধ্যশ্রেনী আর সুবিধাবাদি ভূস্বামীদের নিয়ে জাতি নয়। গ্রামের শতকরা ৯০ জন কৃষকই হল জাতির মেরূদন্ড এবং গ্রামই হল জাতির প্রানকেন্দ্র। তাই নিপীড়িত চাষীদের সমস্যাই হল সত্যিকার জাতীয় সমস্যা। তাদের সংগ্রামই হল আসল জাতীয় সংগ্রাম। তাই সংগ্রামী পুরুষ হরিশচন্দ্র সকল শক্তি নিযে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন চাষীদের সংগ্রামে। চাষীদের অস্ত্র ছিল ধর্মঘট, তীর- বল্লম আর লাঠি। আর হরিশচন্দ্রের অস্ত্র ছিল তার শক্তিশালী লেখনী এবং অফূরন্ত মনোবল।
যোগেশচন্দ্র বাগল মহাশয়ের ভাষায, ‘নীল হাঙ্গামার সময় হরিশচন্দ্রের গৃহ অতিথিশালায় পরিনত হয়েছিল। এই সময় প্যাট্রয়িটের নিয়মিত খরচ চালাইয়া তাহার বেতনের যা কিছু অবশিষ্ট থাকত তৎসমূদই নীল চাষীদের সেবায় ব্যয় করত।’
রানা ঘাটের জমিদার জয়চাদ পাল নীল কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নীলকরদের শোষনের একটা পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছেন ।

‘যেখানে ৮ খানা লাঙ্গলের বাজার দর (মজুরি সহ) এক টাকা সেখানে নীলকরদের দেওয়া দাম ছিল তার অর্ধেক, অর্থাৎ টাকায় ১৬ খানা। নীল চাষে রায়তের কোন লাভই থাকে না। নীল চাষের জন্য নীলকরদের খুর কমই খরচ হতো। যেখানে একজন চাষির এক বিঘা জমিত নীল চাষ করতে খরচ হতো দশ টাকা তের আনা। এছাড়া চাষিকে জরিমানা বাবদ আরও খরচ করতে হতো। যেমন গরুর অনধিকার প্রবেশের জন্য মাথা পিছু প্রতিদিন ছয় আনা। এমব খরচ হিসেবের খাতায় উঠত না।
তাহলে ফসলের জন্য চাষি কি পেত? তার ফসল হতো বত্রিশ বান্ডেল, টাকায় ৮ বান্ডেল করে তার দাম হয় চার টাকা। তাহলে লোকসান দারালো ছয় টাকা তের আনা। পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় নীল চাষ করে কৃষক কিছুই পাচ্ছে না, সারা বছর ধরে স বেগারই খাটছে। এত লোকসানের পরও চাষীকে কুঠিতে গিয়ে সব কড়ায়গন্ডায় রুঝিয়ে দিতে হতো। এভাবে যে চাষি নীলকরের কাছ খেকে একবার দাদর নিত, সে দাদন আর ইহজীবনে শোধ হতো না। নামমাত্র দুই টাকা দাদন নিয়ে চাষিকে চিরদিনের জন্য কৃতদাস হয়ে থাকতে হতো। নিজের জমিতে নিজের খুসিমত ফসল ফলাবার অধিকার কৃষকের ছিলনা। এমনকি নীলের জমি ছাড়া অন্য জমিতে কাজ করার অধিকারও কৃষকের ছিল না।‘
কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে পাদ্রী ফেরারিক সুড় পরিষ্কার ভাষায় অভিমত প্রকাশ করেছেনঃ
“রায়তরা যখন মাঠে কাজ করতে খাকে, তখন তাদের নীলকরদের জমিতে কাজ করার জন্য ডেকে আনা হতো। তৎক্ষনাৎ কুঠিতে হাজির না হতে পারলে তাদের প্রহার করা হতো। এর ফলে কৃষক তার জমিতে ধান, তামাক, গম, ইক্ষু কিছুই চাষ করতে পারত না।”
মোট কথা নীল চাষ করে একমাত্র প্রহার, কয়েদ আর অত্যাচার অবিচার ছাড়া আর কিছুই পেত না হতভাগা চাষিরা। সরকার বাধ্য হয়ে ১৮৬৮ সালে আট আইন জারি করে, নীল চুক্তি আইন বাতিল করে। অপর দিকে নীল করদের বিদ্রোহ চলতে থাকে। তারা এই বছর দলবদ্ধ হয়ে হৈমন্তীক নীলচাষ বন্ধ করে দেয়। তাদের দমন করার জন্য যশোর ও নদীয়ায় জেলায় দুই দল পদাতিক সৈন্য পাঠানো হয়। দুইটা রনতরী টহল দিতে থাকে এই দুই জেলার নদীর পথে। ক্ষীপ্ত হয়ে চাষীরা নীলচাষ বন্ধ করে দেয়। জমিদার তালুকদারের খাজনাও বন্ধ করে দেয়।

১৮৬০ সালের নীলচুক্তি আইন দ্বারা চাষীদের জোর পূর্বক নীলচাষ করার ব্যবস্থা করা হয়। এই সময় চাষীরা সরকারেরর প্রতি সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। হাজার হাজার চাষী জেল খাটে, বহু চাষী পালিয়ে যায়। তবু নীল চাষ করে না। চাষীদের এই ধরনের দৃঢ় সংকল্পের জন্য সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করার পরই চাষীদের উগ্রমূর্তি প্রশমিত হল।

বাংলার ছোট লাট গ্রান্ট সাহেব সরেজমিন পরিদর্শণ করে, নলি চাষীদের দুরাবস্থা দেখে বলেছিলেন, “সরকার যদি ন্যায় নীতি অগ্রাহ্য করে এখনও নীলের চাষ চালাতে থাকে, তবে এর শাস্তিরূপে সরকারকে এক ভয়ংকর কৃষক অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হতে হবে। আর ইউরোপীয় ও অন্যান্য মূলধনের উপর এমন এক বিধংসী আঘাত হানবে যা কেউ কল্পনা করতে পারবে না।”
গ্রান্ট সাহেবের অনুমান সত্যে পরিণত হয়েছিল। বাংলার কৃষকরা যে অভ্যুত্থান ঘটায় তার সামনে নীলকররা মাথা তুলে দাড়াতে সাহসই পায়নি। তারা ব্যবসা গুটিয়ে ধীরে ধীরে একের পর এক সরে পরে।

পরাধীন জাতির অশিক্ষিত অসহায় কৃষকদের জুলুমের বিরুদ্ধে অকুতভয় লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা যোগায়।

লেখকঃ কাস্টোমার সার্ভিস এক্সিকিউটিভ, ডি.বি.বি.এল

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে