হিম


হাসিব হায়াত খান

আমার মায়ের চার বোন দুই ভাই। এর মধ্যে সবচে বড় যে বোন ছিলেন, তিনি জন্ম থেকেই অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী। পুরো গ্রামে তার মতো সুন্দর কেউ ছিলনা, যেই দেখত সেই বলতো- “আল্লাহগো এতো সুন্দর নি কোণ মানুষ হয়”! কিন্তু তার সেই রূপ কোণ কাজে দেয়নি, জন্ম থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিবন্ধি। হাঁটতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটে তাঁর জীবন আর জিভ বেয়ে অনবরত লালা বেরোয়। তখনকার সময়ে গ্রামে উন্নত চিকিৎসার ব্যাবস্থা ছিলনা। তারপরও নানা আমার বড় খালাকে শহরে নিয়ে অনেক নাম করা ডাক্তার দেখালেন, ডাক্তাররা ব্যর্থ হল।

ঝাড়ফুঁক কবিরাজী এসব কিছুও বাদ ছিলনা, কিন্তু তারাও কোনো ফলাফল দিতে পারলোনা না। অবশেষে এক নামকরা পীর সাহেব বললেন, আমার খালার ওপর এক মেটে জ্বীন এর আছর আছে, যার প্রভাবে তাঁর এই অবস্থা হয়েছে। কোণ তাবিজ কবজ করেও লাভ হবেনা, কারন এই জ্বীন খুবই ভয়াবহ, তাকে ধরতে গেলেই সে মাটির নীচে লুকিয়ে পড়ে।    

নানু জায়নামাজে বসে প্রায়ই চোখের পানি ফেলতেন- আল্লাহ আমি মরে গেলে আমার এই মেয়ে কে দেখবে! এর চাইতে ভালো তুমি একে পৃথিবী থেকে তুলে নাও! আল্লাহ নানুর প্রার্থনা গ্রহন করলেন। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে আরা খালামনি মুখে ফ্যানা তুলে মারা গেলেন। মৃত্যুর পর তার স্থান হল আমার নানা বাড়ির থেকে সামান্য দূরে এক বাশ ঝাড়ের বাগানে। সেই বাঁশ ঝাড় বাগান টিও আমার নানাজানের নিজের, কি এক রহস্যময় কারণে তিনি ওটা পরিত্যাক্ত ভাবে ফেলে রাখতেন।

আমার খালা মারা যাবার পরও বেশ কিছু বছর পরের ঘটনা। আমার বাবা থাকতেন শহরে, মা থাকতেন নানা বাড়িতেই। তখনো বাবার চাকরী বাকরি কিছু হয়নি, এক বাসায় লজিং থাকতেন। মাস শেষে বেতন হিসেবে যা পেতেন, তা থেকে সামান্য কিছু পাঠাতেন মা কে, আর বাকিটা দিয়ে তিনি নিজের হাত খরচ চালাতেন। ছুটি পেলেই চার পাঁচ দিন এসে নানা বাড়ি থাকতেন আবার যখনই তাঁর যাবার সময় হতো তখনি মা চোখের জলে তাঁকে বিদায় দিত। এই রকম আর্থিক দৈন্যতার মাঝেও আমার মায়ের কোল জুড়ে একটি পুত্র সন্তান আসলো। নানা তাঁর নাম রাখলেন তইমুর। আমার বাবা বোধহয় তইমুর এর জন্মের সংবাদ শুনে খুব একটা খুশী হতে পারলেন না। কারন এমনিতেই তার টানাটানি অবস্থা, তার মধ্যে এখন সন্তান পালার খরচ  কোত্থেকে জোগাড় হবে!

যাইহোক, জন্মের প্রথম দিন থেকে তইমুর কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল। সে ঠিক মতো বুকের দুধ খেতনা, শরীরের ওজনও ছিল আশংকা জনক ভাবে কম, সবচে বিস্ময়কর ব্যাপার হল, তার কান্না আর পাঁচ দশটি শিশুর কান্নার মতো স্বাভাবিক ছিলনা, কাঁদার সময় গোঙানির মতো কি এক ভয়ংকর শব্দ হতো। জন্মের তিন চার দিনের মাথায় ভাইটি আমার প্রবল জ্বরের মধ্যে পড়লো। অবস্থা এমন যে কোনো ওষুধেই কাজ হয়না। এদিকে গ্রামের লোকজন বলাবলি করতে লাগলো, আরার অর্থাৎ আমার বড় খালার জ্বীনটি এখন ওকে এসে ধরেছে। গ্রামের লোকের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বীনে ধরা ভাইটি আমার পনের দিন প্রচণ্ড জ্বরে ভুগে মারা গেলো আর তারও স্থান হোল ঐ বাশবাগানে অর্থাৎ আরা খালার কবরের পাশে।

একজন মা যে পুত্র হারানোর শোকে পাগল প্রায়, সেদিকে গ্রামবাসীর খেয়াল ও রইল না, সবার মধ্যে কঠিন গুঞ্জন বাঁশ ঝাড় এর ওইদিকে জ্বীনে আছরে মারা যাওয়া দুইটি লাশের কবর, তাই ওখান রাত বিরাতে ভুলেও চলা ফেরা করা যাবেনা। কিন্তু আমার ছোট মামা ছিল খুব দুরন্ত, তখন সবে মাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। তার এই সব জ্বীন ভুতের ভয়ের বালাই পর্যন্ত নেই, তিনি অনেক রাত করে ঐ পথ দিয়ে ঠিক ই বাসায় ফিরতেন।

এমনি এক গভীর রাতে যাত্রা দেখে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। সেদিনের রাতটা ছিল পূর্ণিমার রাত, জোছনার ফকফকা আলোয় সারা গ্রাম ভেসে যাচ্ছে। সঙ্গে টর্চ লাইট থাকা সত্ত্বেও সেটা ব্যাবহারের কোন প্রয়োজন হচ্ছেনা, কারণ এমন আলোয় খুব দূরের জিনিসও পরিষ্কার দ্যাখা যাচ্ছে। আনমনে গান গাইতে গাইতে মামা একসময় বাশবাগানের সামনে এলেন। যেখান টায় তইমুর আর আরা খালার কবর ঠিক সেখান টায় আসতেই কবরের পাশে কেমন যেন একটি মহিলা মানুষের কাশির মতো শব্দ হোল। ব্যাপার টাতে মামার মনে কেমন যেন খটকা লাগলো। তিনি ভাবলেন এতো রাতে বাঁশ ঝাড়ের ভেতর মহিলা আসবে কোত্থেকে। বাঁশ ঝাড় যেহেতু অনেক গভীর সেহেতু সেখানে পূর্ণিমার আলো পরিপূর্ণ ভাবে প্রবেশ করেনা। তাই মামা একটু সামনে যেয়ে কবরের দিকে উঁকি দিতেই ছায়া মূর্তির মতো কিছু একটা দেখতে পেলেন। জিনিসটা কি? ভালো মতো দ্যাখার জন্য যখন ই পকেট থেকে টর্চ টা জ্বালিয়ে কবরের সামনে মারলেন, ঠিক তখনি তাঁর সারা শরীর হিম হয়ে গেল। একটা সাদা শাড়ি পড়া এক নারী বদনা হাতে কবরের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, কিন্তু তার কোণ মাথা নেই।

এই দৃশ্য দ্যাখা মাত্রই মামা টর্চ ফেলে ঝেড়ে দৌড় দিলেন, এক দৌড়ে যখন এসে বাসায় ফিরলেন তখন তিনি পুরোপুরি অজ্ঞান। সবাই ধরা ধরি করে তাকে বিছানায় নিল। কিছুক্ষন পরেই মামার প্রচণ্ড জ্বর উঠলো। দাঁতের সাথে দাঁত লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা। মাথায় ঘণ্টা খানিক পানি ঢালার পর মামা কিছুটা স্বাভাবিক হলেন এবং সব ঘটনা খুলে বললেন আমার নানুকে।

নানা মসজিদের ইমাম ডেকে পরদিনই বাশঝার পরিদক্ষিন করলেন। ইমাম আর নানা জান দুই জনই বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করলেন যে, একটি সাদা শাড়ির কিছু ছেড়া অংশ গাছের সঙ্গে বেঁধে আছে। এর পরপরই নানা কবর বন্ধ দেবার ব্যাবস্থা করলেন। মামাকেও ভয় কাটানোর জন্য তেল পড়া, লবণ পড়া ইত্যাদি খাওয়ানো হল। মামা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও কোণ দিন আর রাতের বেলা ও পথ দিয়ে হেটে যাননি।

পরিশিষ্ট- ঘটনাটি আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা, কোণ পরিবর্তন ছাড়াই হুবুহু এটা পাঠক দের সামনে তুলে ধরলাম।   

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে