সুলতান গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী

মোঃ নবী হোসেন

হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর শাসন আমলে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উপস্থিতিতে এক মহান সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে  বিনা যুদ্ধে পবিত্র জেরুজালেম নগরী মুসলিম শাসনে আসে। জেরুজালেমের এ পতন খ্রিস্টান জগত কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তাই প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষী ইউরোপিয় খ্রিস্টানরা পবিত্র ভূমি জেরুজালেম তাদের আয়ত্বে নেয়ার জন্য পশ্চিম এশিয়ার মুসলমানদের সাথে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সৃষ্টি করে ইতিহাসে তা ক্রুসেড নামে পরিচিত। ক্রুসেড শব্দটি এসেছে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রতীক ক্রুশ থেকে। যারা ক্রুসেডে অংশগ্রহন করেছিল তাদের বলা হত ক্রুসেডার। এই ক্রুসেডের অন্তরালে ইউরোপিয় খ্রিস্টানদের মূললক্ষ্য ছিল  জেরুজালেম দখলের সাথে সাথে কর্তৃত্ব স্থাপন করা, মুসলিম শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করা সর্বপরি ইসলাম ধ্বংস করা। কারন ধর্মীয়ভাবে গোঁড়া, কুসংস্কারাছন্ন স্বার্থান্বেষী খ্রিস্টানরা কখনই ইসলামের বিজয় মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের নামে হত্যা করেছিল অগণিত মুসলমানদের। ক্রুসেডাররা একের পর এক অভিযান চালিয়ে ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষ পরিণতিতে তাদের মাথা নত করতেই হল মুসলিম বাহিনীর কাছে। আর এ মুসলিম বাহিনীর মহানায়ক সুলতান গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী। যাঁর মূল অস্ত্র ছিল ঈমানী শক্তি আর হাতের তীক্ষ্ম তরবারি ইসলামের শত্রুর জন্য আযরাঈল। গাজী সালাউদ্দিন দীর্ঘ বিশ বছর ধরে লড়াই করে জেরুজালেম থেকে রক্তপিপাসু ক্রুসেডারদেরকে উৎখাত করতে সমর্থ হন।

গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরবর্তী কুর্দিস্থানের তাকরিতে জন্মগ্রহন করেন। আইয়ুবী তাঁর বংশীয় নাম। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা ও সমর প্রশিক্ষণ লাভ করেন তার পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও চাচা বিখ্যাত বীর শেরকোহের নিকট হতে। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী ও সুরুচিশীল। তিনি শান্তি পছন্দ করতেন, কখনই যুদ্ধকে সমর্থন করতেন না। কিন্তু তার চাচা তাঁকে বারবার বিভিন্ন অভিযানে পাঠাতেন। এভাবে কিশোর বালক সালাউদ্দিন যিনি  কিনা যুদ্ধ পছন্দ করতেন না সেই তিনিই সাহসীকতা ও রণকৌশলের কারনে ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন অদম্য উদ্দামে নির্ভিক চেতনায় ইসলামের মূল আদর্শে বলীয়ান। গাজী সালাউদ্দিন প্রথমে মিসরের ফাতেমীয় খলিফা আযীযের রাজসভার উজির পদে নিযুক্ত হন। খলিফা আযীযের মৃত্যুর পর সিরিয়ার সুলতান নূরউদ্দিন জঙ্গীর প্রতিনিধি হিসেবে মিসর শাসন করেন। নূরউদ্দিন জংগীর মৃত্যুর পর জংগী বংশ লুপ্ত হলে তিনি মিসরের স্বাধীন সুলতানরূপে শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং ক্রমশ সমগ্র পশ্চিম এশিয়ার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

সবমিলিয়ে ক্রুসেডে ৮টির মত বড় রকমের যুদ্ধ হয়েছিল। ক্রুসেডারদেরকে  খ্রিস্টান যাজকেরা এই বলে উদ্বুদ্ধ করত যে, যে ক্রুসেডার বা ধর্মযোদ্ধা ক্রুশ ধারন করবে তার সকল অপরাধ মওকুফ করা হবে, তাকে সকল রকম পাপ করার স্বাধীনতা দেয়া হবে এবং সে গীর্জা থেকে আশীর্বাদ পাবে। এসব যুদ্ধে ক্রুসেডাররা হাজারে হাজারে  মুসলিম নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐতিহাসিক গীবন বলেন,“খ্রিস্টান ইউরোপের অর্বাচীন, বর্বর ও অশিক্ষিত লোকেরাই ক্রুসেডে যোগদান করেছিল।” ক্রুসেডাররা সিরিয়ার উন্নত শহরগুলোকে ধ্বংস্তুপে পরিণত করেছিল। ত্রিশ লক্ষেরও অধিক বই সমৃদ্ধ সিরিয়ার বিশ্ববিখ্যাত ত্রিপলীজ গ্রন্থাগার আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ ছিল তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু। সুন্দরী যুবতীদেরকে সদর রাস্তার উপর লাঞ্ছিত করা হত। খ্রিস্টান গণকেরা কুৎসিত গানে পবিত্র ধর্মগৃহ অপবিত্র করত। খ্রিস্টানযাজকরা মুসলমানদের ধনসম্পত্তি লুট করে ভাগবাটোয়ারা করত। ইতিহাসবিদ মিল বলেন, “খ্রিস্টানরা  সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, মুসলমানদের প্রতি কোন করুণা প্রদর্শন করা হবে না। মুসলমানদের প্রকাশ্যস্থানে টেনে আনা হয় এবং হত্যা করা হয়। স্তনপানরত শিশুসহ মহিলা, ছেলে মেয়ে সকলকে হত্যা করা হয়। জেরুজালেমের প্রতিটি খোলা জায়গা ও রাস্তা পূর্ণ ছিল মৃতদেহে। সকল বয়সের নারী পুরুষের বিভিন্ন অংগ-প্রত্যংগ ছড়িয়ে ছিল সর্বত্র। কোন খ্রিস্টান হৃদয়ে এতটুকু করুণা জাগেনি, কেউ একটু দয়া দেখায়নি।”

ক্রুসেডাররা যখন এহেন পাশবিক নৃশংসতায় মেতে রইল তখন সালাউদ্দিন আউয়ুবী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ালেন। ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিত্তিনের যুদ্ধে অত্যন্ত নিপুণ রণকৌশলে ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে খ্রিস্টান দখলকৃত শহরগুলোকে তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রনে নেন।  এরপর গাজী সালাউদ্দিন ষাট হাজার ক্রুসেডার বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করেন। এ যুদ্ধে সালাউদ্দিনের বাহিনীর সামনে খ্রিস্টান বাহিনী টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে। নব্বই বছর পূর্বে খ্রিস্টানরা জেরুজালেম দখল করার পর মুসলমানদের উপর অমানবিক হত্যালীলা চালিয়ে ছিল, অথচ জেরুজালেমের পরাজিত খ্রিস্টানদের প্রতি বিজয়ী সালাউদ্দিনের ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ও যথার্থ মানবিক। তিনি সকল খ্রিস্টানকে নিঃশর্তে ক্ষমা করে দেন।  খ্রিস্টান সৈনিকদের হত্যা না করে নগরী ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। বন্দী ক্রুসেডারদের অসহায় স্বজনেরা তাঁর কাছে তাদের মুক্তির জন্য অনুরোধ করলে সুলতান সালাউদ্দিন  বন্দীদেরকে মুক্তি দেন স্ব স্ব পরিবারে ফিরে যাওয়ার জন্য। খ্রিস্টানদের প্রতি এই মহানুভবতা প্রদর্শনের  কারনে সুলতানের কাছের অনেকজনই রক্তের প্রতিশোধ না নিতে পেরে তাঁর উপর মনঃক্ষুন্ন হয়। কিন্তু সুলতান সালাউদ্দিন ইসলামের আদর্শে অবিচল। বন্দী ক্রুসেডাররা  মুক্তি পেয়ে তাদের বাসস্থানে ফিরে গেলে তাদের খ্রিস্টান শাসকেরাই তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। ফলে কোন জায়গায় আশ্রয় না পেয়ে তারা পুণরায় মুসলিম ভূ-খন্ডে আশ্রয় লাভ করে।

পরাজিত খ্রিস্টানরা আবার জেরুজালেম দখল করার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগল। জার্মানের রাজা ফ্রেডারিক বারবারোসা, ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ অগাস্টাস ও ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড এক বিশাল বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের একরি নামক শহর  কয়েক মাস অবরোধ করে রাখলে সেখানকার মুসলমানরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। পরে রাজা রিচার্ডের বাহিনী একরিতে বসবাসকারী অবরুদ্ধ অসহায় মুসলমানদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। রাজা রিচার্ডের এই জঘন্য কাজে সুলতান সালাউদ্দিন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে রাজা রিচার্ডের বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ চলছে। এরই মধ্যে একদিন দেখা গেল রাজা রিচার্ডের  যুদ্ধ শিবিরে সাদা পতাকা উড়ছে। কি ব্যাপার? রাজা রিচার্ডের এত তাড়াতাড়ি যুদ্ধ বিরতি দেয়ার কোন কারন সুলতান সালাউদ্দিন খুজে পাচ্ছেন না। পরে তিনি গোপনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন রাজা রিচার্ড গুরুতর অসুস্থ। সুলতানের অনেক সঙ্গী সাথী তাঁকে এই সুযোগে রাজা রিচার্ডকে আক্রমন করার জন্য বলল। তিনি সঙ্গীদের জানালেন অসহায় অসুস্থকে আক্রমন করা বীরের ধর্ম নয়। তিনি অসুস্থ রাজাকে আক্রমন না করে তার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু তার সুস্থতার কোন খবর পাওয়া গেল না, এ যেন রাজা রিচার্ডের জীবনের আলো নিভে আসছে। এবার গাজী সালাউদ্দিন দরবেশের ছদ্মবেশ নিয়ে রাজা রিচার্ডের শিবিরে গেলেন এবং অসুস্থ রাজার সাথে দেখা করে তার চিকিৎসার ভার নিলেন। শুরু হল চিকিৎসা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সুলতান দরবেশের ছদ্মবেশে রাজাকে ঔষুধ খাইয়ে সারারাত সেবা করে ভোরে আবার ঔষুধ খাইয়ে ফিরে যান। এভাবে তাঁর নিবিড় চিকিৎসায় তিন সপ্তাহের মধ্যেই রাজা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। শেষ দিন দরবেশ বিদায় নিতে চাইলে রাজা তাঁকে কিছু উপহার দিতে চাইলো। কিন্তু তিনি  কিছুই নিলেন না।

অসুস্থ অবস্থায় রাজা তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করতে পারেননি তাই এবার তিনি তাঁর পরিচয় জানতে চাইলেন। দরবেশ বললেন, “আমার পরিচয় না জানলেই কি নয়?” রাজার অনেক পীড়াপীড়ীর পর তিনি বললেন, “আমার পরিচয় জেনে আপনি ভয়ে চমকে উঠবেন নাতো?” রাজা রিচার্ড বললেন, আমি ভীরু কাপুরুষ নই যে কারো জন্য ভয় পাব। গাজী সালাউদ্দিন তখন বললেন, “আপনি যার সাথে যুদ্ধ করতে এসেছেন আমিই সে সালাউদ্দিন।’তাঁর কথা শুনে রাজা রিচার্ডের মাথায় যেন বজ্রপাত হল। গাজী সালাউদ্দিন এবার ছদ্মবেশ খুলে সুলতানের বেশে রাজার সামনে দাড়ালেন। রাজা সুলতান সালাউদ্দিনকে দেখে চমকে উঠলো। শত্রুর প্রতি এমন আচরণ রাজা রিচার্ড কল্পনাও করতে পারেনি। সুলতান বললেন, “আপনি আমার সাথে যুদ্ধ করার জন্য এসেছেন। যদিও আপনি আমার শত্রু তবুও আপনি আমার রাজ্যের অতিথি। আপনার বিপদ আমাকে বিচলিত করেছে। তাই আপনাকে সেবা করার জন্য এই ছদ্মবেশ ধারন করি।”

রাজা রিচার্ড সুলতান সালাউদ্দিনের কাছে ইসলামের আদর্শ নীতির পরিচয় পেয়ে সকল শত্রুতা ভুলে গেলেন। তিনি বললেন, “যার আদর্শ এত মহান তার সাথে শত্রুতা হতে পারে না, হতে পারে বন্ধুত্ব। আজ থেকে আমরা শত্রু নই, বন্ধু। অতপর তিনি সুলতানের সঙ্গে শান্তি-চুক্তি করে তার বাহিনী নিয়ে ইউরোপে ফিরে যান।

অসাধারণ বীরত্ব , চারিত্রিক মাধুর্যতা ও অমায়িক আচরণের দিক দিয়ে সুলতান সালাউদ্দিন ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সফল রাষ্ট্রনায়ক। ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহন করে শ্রেষ্ঠ বীরের মর্যাদা লাভ করেন বলে তাকেঁ গাজী  উপাধি দেয়া হয়। তাঁর উদারতা ও মহানুভবতায় ঘোর শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হত।  প্রজা সাধারনের জন্য  তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু। সবার কল্যাণ সাধনই  ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল, অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। তিনি এতটাই ধর্মপ্রাণ পরহেযগার ছিলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে  নামাযের সময় হলে ঘোড়ার পিঠে আরোহন অবস্থায়ই নামায আদায় করতেন। তিনি জ্ঞাণী গুণীদের খুব সমাদর ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সাম্রাজ্যের সর্বত্র তিনি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, শহরের প্রাচীর, দূর্গ নির্মাণ করেন। এছাড়াও মসজিদ, অনাথ-আশ্রম নির্মাণ করেন। জীবনের শেষ সময় অবধি তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। ধনসম্পদের প্রতি তাঁর কোন মোহ ছিল না। মৃত্যুকালে মাত্র ৪৭টি দিরহাম ও একটি স্বর্ণমুদ্রা রেখে যান। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ ইতিহাসশ্রেষ্ঠ সুলতান গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী দামেস্কে ইন্তেকাল করেন।

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে