বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন

১৭০৬ সালের জানুয়ারী মাস। আমেরিকার বোস্টন শহরের একজন মহাবিজ্ঞানী, নাম বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন। শুধু আমেরিকা নয়, সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর আবিষ্কার বয়ে এনেছে সমৃদ্ধি । তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, মুদ্রাকর, আমেরিকা রাষ্টের সংবিধান রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক, রাষ্ট্রীয় কুটনীতিবিদ, সর্বাপেক্ষা একজন জনপ্রিয় মানুষ।

বেঞ্জামিন ছিলেন বাবা মার পনেরোতম সন্তান। অভাব অনটন ছিল এই বিশাল পরিবারের নিত্যসংগী। আট বছর বয়সে বেঞ্জামিনের বাবা বেঞ্জামিনকে গ্রামার স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু দারিদ্রের কারনে শেষ পর্যন্ত আর স্কুলে পড়া হল না। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এই ছোট বয়সেই বেঞ্জামিনকে সাবান তৈরীর কারকানায় কাজ করতে হয়। কিন্তু তার এসব কাজ করতে ভালো লাগেনা। ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াতে, তবে বিশেষ আকর্ষন ছিল সমুদ্র ভ্রমনে।

কাজে মন নেই দেখে তাঁর বাবা তাকে এক ছাপাখানায় কাজ শেখার জন্য  দিলেন। ছাপাখানা দেখাশুনা করত বেঞ্জামিনের আরেক ভাই । ধীরে ধীরে বেঞ্জামিন কাজে পারদর্শী হয়ে উঠলো। কোন এক বিষয় নিয়ে ভাইয়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় একাই ছাপাখানার কাজ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। পাড়ি জমালেন বোস্টন থেকে ফিলাডেলফিয়ায়। একে তো অজানা অচেনা শহর ,তার উপর সামান্য কিছু পয়সা। কয়েক দিনের না খাওয়া আর অপরিচ্ছন্ন পোশাকে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। নিজের বুদ্ধি আর অক্লান্ত পরিশ্রমে শুরু করলেন ছাপাখানার কাজ। কাজের ফাঁকে নিয়মিত বই পড়তেন। এমনকি রাত কেটে যেত বই পড়তে পড়তে।

ফিলাডেলফিয়ায় দু’বছর কেটে গেল। তিনি এবার ইংল্যান্ডে পাড়ি জমালেন। লন্ডনে এসে নিজের যোগ্যতায় পেয়ে গেলেন বড় একটি ছাপাখানার কাজ। লন্ডনেও দু’বছর থাকার পর  আবার ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে গেলেন। এবার একজন ধনী ব্যক্তির সাহায্যে গড়ে তুললেন বিশাল এক ছাপাখানা। কঠোর পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা আর তীক্ষ্ম বুদ্ধির কারনে অল্পদিনেই পেলেন মুদ্রনশিল্পে বিশাল সফলতা। এসময় তিনি “পেনসেলভেনিয়া গেজেট” নামে একটি পত্রিকার স্বত্বাধীকারী হলেন এবং নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। “পুওর রিচার্ডস আলমানাক” নামে একটি ধারাবাহিক প্রকাশ করেন যা ফিলাডেলফিয়ার জনগনের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৭৩০ সালে তিনি তার প্রাক্তন প্রেমিকা মিস রীডকে বিয়ে করেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত মিস রীড ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের সুযোগ্য স্ত্রী। ফিলাডেলফিয়ার জনগন বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে আপন করে নিল। ধণী এবং খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করলেন । অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি সমাজসংস্কারমূলক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিন।

 “ডুন্টো” নামে একটি সংস্থা স্থাপন করলেন । এর উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উন্নতিতে পারস্পারিক সহায়তা। এই সংস্থায় তিনি যেসব প্রবন্ধ পাঠ করতেন সেই অনুসারে নানা রকম সমাজসংস্কারমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করতেন। সমাজের প্রতিটি সমস্যার প্রতি ছিল তার প্রখর দৃষ্টি। ১৭৩০ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন সর্বপ্রথম ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী স্থাপন করেন যা সারাবিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বইপ্রেমিকদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৭৩৪ সালে তিনি আমেরিকাতে প্রথম বীমা কোম্পানী চালু করেন । এই কোম্পানীর কাজ ছিল আগুনে পুড়ে যাওয়া সম্পত্তির ক্ষতিপূরন দেওয়া। ১৭৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন “ফিলাডেলফিয়া এ্যাকাডেমি” যা পরবর্তিতে ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বেঞ্জামিনের আন্তরিক সহযোগিতায় ও তার বন্ধু ডাক্তার বন্ডের প্রচেষ্টায় ১৭৫১ সালে গড়ে উঠে আমেরিকার প্রথম হাসপাতাল।

এতেই থেমে থাকেননি বেঞ্জামিন, শুরু করলেন বৈজ্ঞানিক গবেষনা। খোলা উনুন তার প্রথম আবিষ্কার। এই উনুন অল্পদিনেই সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ শক্তির প্রতি তার আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশী। একদিন আকাশে তিনি ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে আকাশের বিদ্যুৎ চমক দেখে প্রথম অনুভব করলেন আকাশের বিদ্যুৎ আর কিছুই নয়, এও এক ধরনের ইলেকট্রিসিটি। আগে মানুষের ধারনা ছিল আকাশে যে বিদ্যুৎ চমকায় তা দেবরাজ জিউসের হাতের অস্ত্র। যখন তিনি মানুষকে ধ্বংস করতে চান তখন তিনি তার এই অস্ত্র প্রয়াগ করেন। তাই আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে মানুষ ভীত স্বন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত, পূজা-অর্চনা করত।  বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন সেই ভ্রান্ত ধারনাকে চিরদিনের জন্য মুছে দিলেন। তখন লিডেন জার উদ্ভাবিত হয়েছে। এই যন্ত্রের সাহায্যে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি আবিষ্কার করলেন বৈদ্যুতিক শক্তি দু ধরনের। একটি পজেটিভ, আরেকটি নেগেটিভ। ফ্রাংকলিনের আবিষ্কৃত এই নতুন তত্ত্ব বৈদ্যুতিক গবেষনার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সংযোজন ।

বর্তমানে আমরা যে টিউব লাইট দেখি তা আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।  বৈদ্যুতিক শক্তি, সমুদ্রস্রোত ও তার গতি, প্রকৃতি সংক্রান্ত  গবেষনাপত্র তিনি প্রথম পেশ করেন লন্ডনের রয়াল সোসাইটিতে। এরপর থেকেই তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া তিনি প্রথম বাইফোকাল লেন্সের ব্যবহার  শুরু করেন। বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন এর আবিষ্কার এবং বৈজ্ঞানিক গবেষনামূলক রচনা অল্পদিনেই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী মহলে সাড়া জাগালো এবং এই সমস্ত বিজ্ঞানীরা বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে সাদরে সম্ভাষন জানালো। বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের প্রতিভা আর বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতা দেখে ইংল্যান্ডের  রয়াল সোসাইটি তাঁকে তাদের সদস্য নির্বাচন করল । বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টর উপাধি পেলেন।

দেশের উন্নতির জন্য তিনি ক্রমস রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন। ১৭৫০ সালে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হলেন এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার জন্য আমেরিকার প্রতিনিধি হয়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ,আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডে রাষ্ট্রীয় সফর করেন এবং সবজায়গায় তিনি আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপর ফলপ্রসু আলোচনা করেন এবং সবজায়গায় তিনি বিপুল সম্মানে ভূষিত হন।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি আমেরিকার প্রতিনিধি হয়ে ফ্রান্সের সংগে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অস্ত্র ও সৈন্য সংগ্রহ করেন। ১৭৮৩ সালে আমেরিকা স্বাধীন হলে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে পেনসিলভেনিয়ার শাসন পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত আমেরিকার শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ডাক পড়ল বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের। তিনি রচনা করলেন আমেরিকার সংবিধান। এই সংবিধানের মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের সূচনা করলেন।

বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন সারা জীবন ধরে মানুষের সেবা করে গেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নিগ্রো সম্প্রদায়কে দাসপ্রথা থেকে মুক্তি দেবার লক্ষ্যে আন্দোলনের ডাক দিলেন। তখন তার বয়স আশিউর্দ্ধো।

এভাবে জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন সমাজ সংস্কারে, রাষ্ট্রীয় ঐক্যবোধে জাতীয় চেতনায় আর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ করার জন্য আবিষ্কারের নেশায়। এইসব বহুমূখী কাজের মাধ্যমে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন আজও হয়ে আছেন সবার পরম শ্রদ্ধার পাত্র। ১৭৯০ সালে এই মহান হিতৈষী বন্ধু মৃত্যুবরন করেন।

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে