বীজগণিতের জনক-আল খোয়ারিজমি

মোস্তফাকামাল

আমরা অনেকেই অনেক বিখ্যাত গণিতবিদের নাম শুনেছি, যেমন কার্ল ফ্রেডরিক গাউস, রামানুজন, পিয়ে দ্য ফার্মা অন্যতম। আবার অনেক বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক, আলকেমিস্ট ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সীনা, জাবির ইবনে হাইয়ান সুপরিচিত। তাদের মধ্যে বিখ্যাত একজন মুসলিম গণিতবিদ হল আল খোয়ারিজমি। মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। তিনি ছিলেন একাধারে গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী তাঁর পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল খোয়ারিজমি। আজ আমরা আল খোয়ারিজমি জীবন ও গনিতে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করব। তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার আরব সাগরে পতিত আমু দরিয়ার নিকটে একটি দ্বীপের নিকটে অবস্থিত খোয়ারিজম নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এটি ছিলো পারস্যের অন্তর্গত খিভা প্রদেশে। আল খোয়ারিজমি তাঁর বাল্যকাল ও কৈশোর সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন (৮১৩ – ৮৩৩) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাইতুল হিকমা (হাউজ অফ উইজডম, লাইব্রেরি ও অনুবাদ কেন্দ্র) এর একজন সদস্য পণ্ডিত ছিলেন। তিনি সেখানে প্রধান লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কাজ করতেন। এখানে বসেই তিনি বিজ্ঞান ও গণিত চর্চা করেন এবং গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত অনেক বৈজ্ঞানিক রচনা অনুবাদ করেন। খলিফা মামুনের মৃত্যুর পরও পরবর্তী খলিফা আল ওয়াতহিক এর শাসনকালের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি পাটিগণিত, বীজগণিত, ভূগোল,  জ্যোতিবিজ্ঞান ও জ্যামিতিতে প্রভৃত ভূমিকা রাখেন। তবে মূলত বীজগণিতের জন্যই তিনি সবচেয়ে আলোচিত হন।

আল খোয়ারিজমি ছিলেন বীজগণিত তথা এলজেবরার (Algebra) জনক। তাঁর লেখা “আল-জাবর ওয়া-আল-মুকাবিলা” আধুনিক বীজগণিতের মূল ভিত্তি বলে ধরা হয়। আগে মানুষ গণিত বলতে শুধু হিসাব নিকাশ বা পাটিগণিতকেই বুঝতো। এই বইটির নাম অনুসারে বীজগণিতের ইংরেজী নাম এলজেবরা (Algebra)  উৎপত্তি লাভ করে। Algorithm শব্দটি Alkhwarizmi নামের ল্যাটিন অপভ্রংশ algorismi হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। এলজেবরায় লিনিয়ার বা একঘাত এবং কোয়াড্রেটিক বা দ্বিঘাত সমীকরণ আছে।

তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক বহু গ্রিক ও ভারতীয় গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। পাটিগণিত বিষয়ে তিনি একটি (কিতাবুল জাম ওয়াল তাফরিক ফি হিসাব আল হিন্দ) বই রচনা করেন যা পরে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকে ভারতীয় গণিতবিদগণ দশমিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। এই পদ্ধতিকে খোয়ারিজমিই প্রথম ইসলামী জগতে নিয়ে আসেন।

তিনিই গণিতে শূণ্যের ব্যবহার করেন। গ্রীক ও ভারতীয় গণিতবিদদের মধ্যে গণিতের যে অসূম্পূর্ণতা ছিল, সে অসম্পূর্ণতা পূরণ করেছিলেন আল খোয়ারিজমি। এ শূণ্য লিখন প্রণালীকে তিনিই সর্বশেষ রূপদান করেন। ইউরোপীয়রা মুক্তকন্ঠে এ কথা স্বীকার করেন। এই শূণ্য ব্যবহার করার ফলে গণিত এসে দাড়ালো পরিপূর্ণ প্রেক্ষিতে। তিনি এখানেই থামলেন না। ভগ্নাংশ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ভারতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার সময়ে তিনি আবিষ্কার করেন ভগ্নাংশের বিস্ময়কর দিক।

গণিতের আরেকটি শাখা হলো ত্রিকোণমিতি। সমকোণী ত্রিভুজের তিন কোণ আর বাহু নিয়ে ত্রিকাণমিতির কারবার। আল খোয়ারিজমি উদ্ভাবন করেন ত্রিকোণমিতির বিস্তারিত উপাত্ত। তিনিই কনিক সেকশনের গাণিতিক ধরণের আধুনিকায়ন করেন। এরপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন ক্যালকুলাসে।

আল খোয়ারিজমি জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর জিজ আল সিন্দ হিন্দ বই রচনা করেন। এ বইয়ে প্রায় ৩৭ টি চ্যাপ্টারে ক্যালেন্ডার ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক আলোচনা করেন। এ বইটিও ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা দ্বারা প্রভাবিত। এ বইয়ে তিনি সূর্য, চন্দ্র ও তৎকালীন আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহের গতিবিধি এবং সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তথ্য ও উপাত্ত সহ আলোচনা করেন। এখানে তিনি সাইন ও ট্যানজেন্ট নিয়েও আলোচনা করেন।

এছাড়া তিনি ভূগোল বিষয়ক বই “কিতাবুল সুরত আল-আরদ” রচনা করেন। টলেমী সুচিত অনেক ভৌগলিক ধারণার তিনি সংশোধন করেন। ইউরোপীয়রা এতে বিস্মিত হয়। টলেমির মানচিত্র পর্যন্ত তিনি সংশোধন করেন এবং তিনি তাতে একটি মানচিত্র সংযুক্ত করেন। তাঁর উদ্যোগে দুনিয়ার একটি বাস্তবরূপ তৈরী করা হয়, যা পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কনে নমুন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আল খোয়ারিজমি প্রথম পৃথিবীকে সপ্ত ইকলিম বা মন্ডলে ভাগ করেন। এই সূত্র ধরেই আবহাওয়ার পরিমন্ডল অনুসারে পৃথিবীকে সাতটি মহাদেশে ভাগ করেন। তাঁর লেখা আরো দুটি বই হলো কিতাব আল-রুখমাত (সূর্যঘড়ির বই) ও কিতাব আল তারিখ (ইতিহাসের বই), যা কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যায়।

এই মহান বৈজ্ঞানিক জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। সম্ভবত ৮৪৭ বা ৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি মৃত্যুমুখে পন্ডিত হন। খলিফা মামুনের মৃত্যুর পরও তিনি এক যুগের অধিক জীবিত ছিলেন। বিজ্ঞানে মৌলিক অবদানের জন্য আল খোয়ারিজমি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৬ শতক পর্যন্ত তাঁর অনেক বই ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত ছিল। তাঁর থেকেই পাওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা “আল জেবরা ও আলগরিদমের”। তাই তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়। জ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহই তাকে একজন পুরোপুরি বিজ্ঞানীতে পরিণত করে তুলেছিল। ইউরোপীয় গণিতের ভিত্তি হিসেবে আল খোয়ারিজমির গবেষণা কর্মের ভূমিকা অমূল্য।

পরিশেষে বলা যায়- গ্যালিলিও ও নিউটন এর মত বিজ্ঞানীদের কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু তাদের মত মেধা সম্পন্ন মুসলিম বিজ্ঞানীদের কথা অজানাই থেকে যায়। আল খোয়ারিজমি এমনই ধরণের একজন বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন।

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে