দুর্ভাগা বাংলা

মোঃ আসলাম হোসেন

বাংলা নামের একটি দেশ। সবুজ শ্যামলীমায় ঘেরা। সতেজ তরুলতার মত প্রাণোচ্ছল সবুজ হৃদয়ের সহজ সরল শান্তিপ্রিয় এখানকার মানুষগুলো। প্রায় দুই হাজার বছর পূর্ব থেকে এ অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত ভাবে জন বসতি গড়ে উঠতে থাকলেও বাংলা ভাষা তথা বাঙালী হিসেবে আমাদের জাতি সত্ত্বার বিকাশের ইতিহাস বার তের শত বছরের বেশী নয়। আজকের বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডে অবস্থিত অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা থেকে শুরু করে দক্ষিণের গোটা অঞ্চল (বৃহত্তর ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীসহ খুলনার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল) বার তেরশ বছর আগেও ছিল জলাভূমি আর নল খাগড়ার জঙ্গলে ভরা। সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চল, গোটা উত্তর বঙ্গ এবং বৃহত্তর কুষ্টিয়া (নদীয়া), যশোর অঞ্চল এবং বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের (ভারতের) ভিন্ন ভিন্ন কিছু রাজ্য নিয়ে বর্তমান বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বা বাঙালী জাতি স্বত্ত্বার বিকাশ শুরু হয় প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে। আদিতে এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ ছিল অনার্য দ্রাবিড় বা চন্ডাল। যাদের ভাষা সংস্কৃত ছিলনা। মাগধী প্রকৃত এর বিকৃত রূপ এবং স্থানীয় শব্দমালার সংমিশ্রণে তথাকথিত এই অপবিত্র ও নীচ জনগোষ্ঠীর অপবিত্র ভাষা ছিল বাংলা। যার রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি ছিলনা।

মৌর্য এবং পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মবলম্বী হওয়ায় এবং বৌদ্ধ ধর্মে কোন বর্ণবাদ বা জাত পাতের বালাই না থাকায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। আর বৌদ্ধ ধর্ম গুরুরা বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যেই বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ ভক্তিমূলক যে সমস্ত গীতিকাব্য বাংলাতে রচনা করেছিলেন সেটাই এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পুরাতন নিদর্র্শন। এ পর্যন্ত আবিস্কৃত পুরাতন গ্রন্থটি হল চর্যাপদ। এভাবে বাংলা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে ধর্মীয় স্বীকৃতি পেল বৌদ্ধদের দ্বারা। তারপরও এই ভাষার চন্ডাল আর গুরুদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র-ঈশ্বরচন্দ্রদের যুগের পরে। অবশ্য ইতিমধ্যেই বাংলা সুলতানী আমলে (তের-সপ্তদশ শতক) রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে যায় রাজনৈতিক কারণেই। ফার্সী ভাষাভাষী সংখ্যালঘু তুর্কী, পাঠান ও মুঘল শাসকরা স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন; এবং এই সময় রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বাংলা ভাষার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়।

সুফী সাধক ও দরবেশগণ বাংলাতে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রেও বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। লোক সঙ্গীত, পুঁথি সাহিত্য, পালা গান, জারি গানের ব্যাপক প্রসার ঘটে এ সময়ে। পরবর্তীতে ইংরেজরাও বাংলা ভাষার উন্নয়নে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাদের দ্বারা বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণের অনেক উন্নতি সাধিত হয়। মূলত আলাওল, মাগন ঠাকুর থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র্ররা এ ভাষাকে ব্যাপক সমৃদ্ধ করেন আর চরম এবং পরম পূর্ণতা আসে লালন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলদের অসাধারণ হাতের পরশে। আরো হাজারো মণীষীর অবদানে পেয়েছি আমরা ‘মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা’। আমাদের ভাষাকে অনেক অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়ে অনেক সংগ্রাম করে অপবিত্রতার গ্লানি মুক্ত হতে হয়েছে। জীবন দিয়ে ভাষার অধিকার আদায় করতে হয়েছে। এমন নজীর পৃথিবীর আর কোথাও নাই। এমন কিছু উপমা আমরাই সৃষ্টি করেছি যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন।

সুজলা-সুফলা এই জনপদে অতি প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমনে এখানে একটি সংমিশ্রিত জাতিসত্ত্বা বিকাশ লাভ করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি বাংলা আক্রমন করে তাদের পদানত করেছে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এই জাতিসত্ত্বার সাথে মিশে এদেশের ভাগ্যের সাথে নিজেরদের ভাগ্যকে এক সূত্রে গেঁথে নিয়েছে। একই ভাবে দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম শাসকগনও এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে একত্ব হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনে  বাংলা  শিল্প সাহিত্যে যেমন উন্নতি লাভ করে তেমনি উন্নতির চরম শিখরে উঠে আসে ব্যবসা বানিজ্য ও অর্থনীতিতে উদার মুসলিম শাসকদের

প্রজা বৎসল নীতিতে বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ শান্তির অভাব ছিল না। সারা বিশ্বের সাথে তখন বাংলার ব্যবসা বানিজ্য চলত। জগৎখ্যাত ‘মসলিন’ বাংলা থেকে সারা বিশ্বের অভিজাত শ্রেণীর কাছে রপ্তানী হত।

বস্ত্র, রং, মসলা, কৃষিপন্য, কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন শিল্পজাত পন্য তখন রপ্তানী করে বাংলা বিশ্বের প্রধান ৫টি রপ্তানী কারক দেশের একটিতে পরিনত হয়। মাংসের গন্ধে যেমন হায়েনার দল ছুটে আসে তেমনি ভাবে ভারত বর্ষের অর্থনীতির চরম উন্নতির কথা জেনে ইউরোপীয় দস্যুরা ভারত বর্ষে আসতে শুরু করে। সর্বপ্রথম আসে পর্তূগীজরা (পর্তূগাল) এরপর ডাচ (নেদারল্যান্ড), ফরাসী ও ইংরেজরা। প্রথমদিকে এরা জলদস্যুপনা করত। মুসলিম বানিজ্য জাহাজ এবং উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতি, লুন্ঠন, লোকজন ধরে নিয়ে গিয়ে কৃতদাস হিসেবে বিক্রয় করা ছিল তাদের কাজ। তখন তাদেরকে ডাকা হত হার্মাদ বলে। এই হার্মাদ (ইউরোপীয় জলদুস্যুদের) কথা ঐ সময়ের সাহিত্য ও ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে তারা ব্যবসায়ে মনোনিবেশ করে। এই ব্যবসায়ের মধ্যেও তাদের দস্যুপনা মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। ১৬১৫ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক ইংরেজদের বিনা শুল্কে বানিজ্য করার অধিকার প্রদানের ফলে তারা আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে। মুসলিম শাসকদের উদারতা এবং এদেশের মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে, এদেশের কিছু স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতকদের সাথে নিয়ে তারা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের ফলে সর্ব প্রথম বাংলা তার স্বাধীনতা হারায়। তারপর একে একে গোটা ভারতবর্ষ তারপর গোটা পূর্ব এশিয়া ও অষ্ট্রেলিয়া।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন নদীয়া জেলার (ভারতের পশ্চিম বঙ্গেঁ অবস্থিত, যার অর্ধেকটা বতমানে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া অঞ্চল) পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের নামে এক প্রহসনের ষড়যন্ত্রমূলক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। যার ফলে বাংলা তার স্বাধীনতা হারিয়ে সর্বশান্ত হয়। ষড়যন্ত্রকারীরাও বুঝতে পারেনি যে, তাদের সামান্য হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে যেয়ে নিজ জাতির সাথে গাদ্দারী করে এ জাতির জন্য কত বড় সর্বনাশ তারা ডেকে এনেছিল। আষাঢ়ের সেই বর্ষণ ভরা দিনে যেদিন পলাশীর প্রান্তরে যে বৃষ্টি বর্ষণ নবাবের গোলা-বারুদ ভিজিয়ে দিয়েছিল। তার চেয়ে হাজারগুন বেশী চোখের পানি ভারতবাসীকে ফেলতে হয়েছিল ইংরেজদের লুন্ঠন, জুলুম ও অত্যাচারে। তার চেয়ে অনেক বেশী রক্ত ঝরাতে হয়েছিল দীর্ঘ দুইশত বৎসর ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ৩০ লক্ষ জীবন উৎসর্গ করতে। পলাসীর ভাগ্য বিপর্যয়ের পর বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। চরম জুলুম নির্যাতন করে আমাদেরকে সর্বস্বান্ত করে নি:স্ব সর্বহারা ভিখারী জাতিতে পরিণত করেছে। সকল কালেই মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, জগৎশেঠ, রাজবল্লভরা তাদের জাতির সঙ্গে গাদ্দারী করেছিল। নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে (সেদিন তারা তাদের বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে পলাশী প্রান্তরে পুতুলের মত দাড়িয়ে থেকে বাংলার পরাজয় ও সর্বনাশ নিশ্চিত করেছিল।) কিছু সিরাজ-উদ-দৌলা, মোহনলাল, মীর মার্দানরা দেশের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য ও দেশ প্রেমের পরাকাষ্ঠ দেখিয়ে দেশের জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দ্বিধাবোধ করেনি। নতুন প্রজন্মের কাছেও দেশ এমনটিই চায়।

সম্পাদক ও প্রকাশক

All News

পলাশী ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণাম

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা যুদ্ধ ছিল না, কারণRead More

ইচ্ছে

পরী