চির বিদ্রোহী বীর

মোস্তফা কামাল

‘সেই যুগ’ মানে এখন থেকে ১১৩ বছর আগের কথা। যা ছিল গোটা একটা দেশ ভেঙ্গে হল দু’টুকরো। একটা পশ্চিমবঙ্গ আর অন্যটা বাংলাদেশ। আজকের মতো কথনো সেই অখন্ড বঙ্গদেশে গ্রামই ছিল আসল। গাঁ-গেরামের মানুষ, চালচুলো নেই, পেটে ভাত নেই পরনের কাপড় ততটুকুই যতটুকু না থাকলেই নয়। রোগের চিকিৎসা নেই, শিক্ষার সুযোগ নেই। খরা হয়, বৃষ্টি হয়, মাঠ জ্বলেপুড়ে যায়, ফসল হয় না, ঘরেতে অন্ন নেই। বন্যা-প¬াবন জমিদারের অত্যাচার আর ইংরেজদের জুলুম অনাচারে অতিষ্ট জনপদ বঙ্গদেশ। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ইচ্ছে হলেই তখন ছুটে যাওয়া যায় না। এতো যানবাহনও ছিল না, এতো ভালো রাও তৈরি হয় নি, এরকমেই একটা অজ পাড়া গাঁ, বর্ধমান জেলার একটি গ্রাম চুরুলিয়া। হিন্দু ও মুসলমানের বাস এ গ্রাম। এরই মাঝখানে একটা বাড়ি। নেহাতই সাদামাটা। মাটির দেয়াল ও খাড়ের চাল। এখানেই বাস করে একটি পরিবার যার নাম কাজী পরিবার। অতীতের ধন সম্পদ এখন আর নেই তবে আছে বংশগৌরব। বিদ্যা চর্চার চল তখনো বজায় আছে ঠিকই।

অবশ্য, সব কথাই তো থামে একসময়। আমাদের গল্পেও শেষ হবে। সব রাস্তাই তো শেষ হয় কোনোখানে। আমাদের পথচলাও থামবে। তবু বলে নেওয়া ভালো যে এই পথ অনেকখানি, সময়ও লেগেছে র্দীঘ। ১৮৯৯ সালের মাঝামাঝি পথে নেমে গন্তব্যে পৌঁছুনো কোন সুদূর ১৯৭৬-এ। চলা শুরু করেছি অখ্যাত কোন এক চুরুলিয়া গ্রাম থেকে, আর শেষ হল তা বাংলাদেশের রাজধানী-শহর ঢাকায় এসে।

১৮৯৯ সালের ২৪শে মে। বাংলা সন ১৩০৬, তারিখ ১১ই জ্যৈষ্ঠ। মঙ্গলবার। নতুন একটি শিশুর আগমনে মুখর হয়ে উঠল কাজী-বাড়ি। কাজী আমিনউল¬াহ্-র পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয়া পতœী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান ভূমিষ্ঠ হল। নবজাতকের নাম রাখা হলঃ কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম সন্তান পুত্র কাজী সাহেবজানের পর চার-চারটি পুত্র একে একে অকালে বাপ-মায়ের কোল খালি করে চলে গেছে। তারপরে আসে কাজী নজরুল ইসলাম। দুখের সংসারে এসেছে বলে নাম দেয়া হলো দুখু মিঞা। বংশানুত্রুমিকভাবে মসজিদের ইমামতি আর মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পান পিতামহ কাজী আমিনউল¬াহ্-র পর তার পুত্র কাজী ফকির আহমদ।

চুরুলিয়া কোনো বিত্তশালী গ্রাম নয়, তবে সেখানে ছিল মার্জিতরুচি শিক্ষিত একটি ভদ্রসমাজ। প্রমাণ-ছোট গ্রাম, তবু মক্তব আছে, মক্তব বসছে গাঁয়ের ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্যে, সুশিক্ষিত মৌলভি আছেন, পড়ুয়াদের আনাগোনা চলছে। বজলে করিমের মতো লেখাপড়া-জানা মানুষও রয়েছেন একেবারে মূর্খদের গ্রাম তো একে কোনোভাবেই বলা চলে না।

দুখু মিঞার শৈশবের কোনো ছবি আমাদের সামনে ধরা নেই। দুখু মিঞাদের কোনো শৈশব থাকে না। আর যদি-বা সে দৈবাৎ কপালগুণে বিখ্যাত হয়ে যায় হঠাৎ, তা হলে তখন অবশ্য লোকে চেনে তাকে, কদর করে। কিন্তু তার ফেলে-আসা শৈশব তো তত দিনে কোথায় হারিয়ে গেছে! কবি নজরুল ইসলাম দুখু মিঞার কোনো জীবনী লেখেন নি, কোনো গল্পও কখনো রচনা করেন নি। দুখু মিঞার শৈশব কেউ আমাদের জন্যে লিখে রেখে যায় নি।

গ্রামের ছেলে দুখু খোলা মেলা মুক্ত প্রকৃতির ভিতরে বেড়ে ওঠে। তাঁর হাতেখড়ি তার বাবার কাছে। চুরুলিয়ায় স্কুল ছিল না, ছিল মক্তব। তাই কাজী ফকির আহমদ নজরুলকে মক্তবে পাঠালেন। বালকের স্মৃতিশক্তি ছিল চমৎকার। মক্তবে মৌলভির কাছে কোরআন পড়তে শেখা আর ফার্সি ভাষা শিক্ষার গোড়াপত্তন। কিন্তু বই মুখে নিয়ে বসে থাকলে কি চলে? বাড়ির টুকটাক কাজ, বাবার পিছুপিছু মাজারে যাওয়া, ওজুর পানির বদনা এগিয়ে দেওয়া এগুলোও তার করতে হয়।

বাবার চাচাতো ভাই কাজী বজলে করিম ফার্সি ও উর্দু জানতেন চমৎকার। বাংলাতেও ভালো দখল ছিল। চাচা-ভাইপোর সম্পর্ক ছিল মধুর। শিশুর মনে ভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়েছেন এই পিতৃব্য। ১৩১৪ সালের ৭ই চৈত্র হঠাৎ করেই নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমদ মারা যান। এরপরেই লেখাপড়া খতম। গরিবের ছেলের বেশি লেখাপড়া দরকার কী? এতটুকুই যথেষ্ট। এখন যা প্রয়োজন উপর্জন। ঐ মক্তবে চাকরি আর পিতার শূণ্যস্থান পূরণে মাজারের খাদেমগিরি আর ইমামতি।

চাচা বজলে করিমের ছিল ‘লেটোর’ দল। কাব্যরসিক এই ব্যক্তি বালক নজরুলের মনে অলক্ষ্যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে লাগল। এই বীজ থেকেই একদিন মহীরুহ হবে। শুরু হল মুখে মুখে পদ্য বানানো। অদ্ভুত তার ভাষা। আরবি, ফার্সি, বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে। আর কত সুরেলা পুঁতি পড়া। কবিগানের একটা ধরণ ছিল ‘লেটো’ গান। ‘লেটো’ নাচ বললেও ভুল হবে না। কয়লাকুঠির দেশে, অর্থাৎ আসানসোল-রানীগঞ্জ অঞ্চেলে এর খুব প্রচলন ছিল। লেটো গান বা নাচ দুটোই একসঙ্গে। বালক দুখু মিঞা লেটো গানই কি কম শুনেছে? অনেক রাত হয় তো পার করে দিয়েছে আসরে বসে। শুরু হলো আমাদের দুখু মিঞার গান আর ছড়া বানালো। বজলে করিমের ভাইপো দুখু মিঞা রাতারাতি ক্ষুদে কবি ব’নে যায়। গ্রাম্য কবি।

চুরুলিয়া ও তার আশপাশের গ্রামগুলোয় দু-তিনটে নামকরা লেটোর দল ছিল। একটা তো ছিল চাচা বজলে করিমেরই। তাদের চোখ পড়ল দুখুর ওপর। শুরু হলো লেখা। গান ও পালা লেখা। লেটোর দলের সঙ্গে মিশে গেল দুখু। লেটোর দলে ঢুকে পড়ায় তার সংসারে দিক থেকে লাভ সেটা হয়েছিল তা আর্থিক। বড়ো ভাই কাজী সাহেবজান কষ্টে সৃষ্টে একটা চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে কয়লাখনিতে। বাবা যখন মারা যায় তখন তার বয়সই বা আর কত? বড়ো জোর তের-চোদ্দ। লেটোর দল থেকে যে ক’পয়সা আয় হয় দুখুর তাও চলে যায় সংসারের পেটে। দু’ভাইয়ের আয় জোড়াতালি দিয়েই তবে মা-ভাই-বোনের মুখে অন্ন জোটে। ক্ষুদে কবি হিসাবে চারপাশের গাঁ-গেরামে দুখুর খুব সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, সে হয়ে উঠল অন্যদের চোখে এক ক্ষুদে ওস্তাদ। শুরু হল উপর্জনের যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো। এই সময়ের কাহিনী দুখু কোথাও লেখেনি। লিখে গেছেন তাঁর ছোটবেলার বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় মানে শৈল। শৈল এর দুটো বইঃ “কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে।” আর “আমার বন্ধু নজরুল।”

এক সময় দেখা হয়ে গেল রেল লাইনের গার্ড সাহেবের সাথে। নজরুলকে নিয়ে গেলেন গার্ড সাহেবের বাড়িতে। চমৎকার কাজ- রেল ষ্টেশন থেকে প্রসাদপুরের বাংলো গার্ড সাহেবকে পৌছে দেওয়া, টিফিন-ক্যারিয়ারে খাবার ভর্তি করে প্রসাদপুর থেকে নিয়ে আসা। আর একদিন অন্তর ট্রেনে চড়ে আসানসোল যাওয়া আর সেখান থেকে বিলিতি মদ কিনে আনা। সাহেবের বাড়িতে খারাপ ছিল না দুখু। তবে এই চাকরিও কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হয় নি। সাহেব গার্ডের বাসায় চাকরি করার ফলে অন্তত একটা লাভ হয়েছিল। গ্রামীণ সমাজের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল দুখু। মফঃস্বল শহর, কলকারখানা, নানা ধরনের পেশা, নানা জাতের লোক-এসব তো সে জানতেই পারত না চুরুলিয়া থেকে বেরিয়ে না এলে।

দুখু এবার একটা চা-রুটির দোকানে চাকরি পেয়ে গেল। খাওয়া মিলবে, মাইনে মাসে- এক টাকা। তবে থাকা চলবে না, যেহেতু জায়গা নেই। অতঃপর রাতের আস্তানা হলো একটি ত্রিতল ভবনের সিঁড়ির নিচে। থাকতেন এক দম্পতি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল¬াহ্ ও তাঁর স্ত্রী শামসুন্নেসা খানম। একদিন ঘুমন্ত দুখুকে সিঁড়ির নিচে আবিস্কার করেন কাজী রফিজউল¬াহ। দুখুর কষ্ট দেখে নিয়ে গেলেন তাঁর সঙ্গে। খাওয়া দাওয়া সব ফ্রি, আর মাস গেলে মাইনে পাঁচ টাকা। কাজ আর কী? ফাইপরমাশ খাটা, অর্থাৎ চাকরের কাজ। খাদেম-ইমাম দুখু মিঞা, লেটো দলের কবি দুখু মিঞা, বাবুর্চি খানাসামা দুখু এবার গৃহভৃত্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নাহ্ ভাগ্য ভালো, পরিশ্রম তেমন কিছু নয়- ঐ রুটির দোকানে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির চেয়ে হাজার গুণ ভালো। কাজের মধ্যে প্রধান কাজ কাজী সাহেবকে তামাক সেজে দেওয়া। নিঃসন্তান দম্পত্তির অপত্যস্নেহ দুখুকে ঘিরে রাখা। দুখুর গান ও কবিতার রচনার দক্ষতা দেখে রফিজউল¬াহ্ সাহেব পাঠিয়ে দিলেন তাঁর বড়ো ভাই কাজী সাখাওয়াতউল¬াহ্-র গ্রামে। তাঁর কাছে থাকবে, পড়াশুনা করবে। কাজীর সিমলা গ্রাম, সেখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তমশ্রেণীতে ভর্তি হল। ফ্রি স্টুডেন্টশিপ মিলেছিল। ঘটনাটি ১৯১৪ সালের, নজরুল তখন পনেরো বছরের কিশোর।

পরে দরিরাপুর স্কুল ছেড়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে এবার শিয়াড়শোল স্কুলে ক্লাস সেভেনে ফের ভর্তি হল। এখন থেকে সে আর দুখু মিঞা নয়, এবার থেকে নজরুল। শুধু কারো কারো কাছে কেবল নুরু, ভালোবাসার ডাক। শেষ হলো বার্ষিক পরিক্ষা, বার্ষিক পরিক্ষার ফল এতোই ভালো যে এইটকে ডিঙিয়ে এক লাফে ক্লাস নাইন। একেবারে ডবল প্রোমোশন। নুরুর এই সব গল্পও লিখছে তাঁর বন্ধু শৈল। স্কুলের গল্প-

            ব্যবস্থা হলো, শিয়াড়শোল রাজার ইস্কুলে মাইনে লাগবে না, সেই খানেই পড়বে। থাকবে রায়-সাহেবের ফুল-বাগানের পাশের মাটির একটি ছোট্ট ঘরে। খড় দিয়ে ছাওয়া এক ছোট্ট ঘরখানির নাম-‘মহামেডান-বোর্ডিং’। একদিকের একটি জানলার পাশে ছোট্ট একটি খাটিয়া। খাটিয়ার উপর পরিস্কার একটি বিছানা পাতা। বিছানার ওপর ছোট্ট ছোট্ট দুটি বালিশ আর বই-খাতার ছড়াছড়ি। দেখলেই চেনা যায়- অগোছালো কোন এক ছন্নছড়া ছেলের আস্তানা।

নুরু- কাজী নজরুল ইসলাম, শৈল- শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আর শৈলেন- শৈলেন্দকুমার ঘোষ ছিলেন অকৃত্রিম তিন বন্ধু। একজন মুসলিম, একজন হিন্দু আর একজন খ্রিষ্টান। নজরুল ছিলেন প্রখর মেধাবী, তীক্ষ্ম স্মৃতিশক্তি, তাই হাসিখেলার ভিতর দিয়ে পড়াশোনার কাজ সারা হয়। সারা দিন বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয় না তাঁর। সাঁতার জানে না নুরু, তাই পুকুরে নামে না। লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না। তারপর আর কি! সাঁতারের চেষ্টা এবং দু’বন্ধুরই সলিলসমাধি হওয়ার জোগাড়। পাশের ঘাটে স্মান করছিল মকবুল, সেই বাঁচিয়ে দিল। বন্ধু পঞ্চু খাস কলকাতা থেকে একটা এয়ারগান আনিয়েছে সাহেবের দোকানে চিঠি লিখে। নজরুল মারবে পাখি! ওর যা নরম মন! দালানে বাসা বেঁধেছিল চড়ুই। তার একটা কচি বাচ্চা হঠাৎ করে পড়ে গেল মাটিতে। তখনো বেচারা উড়তে শেখেনি। শেষ পর্যন্ত কোত্থেকে খুজেঁ একটা মই ঘাড়ে করে নিয়ে আসে নুরু। মই বেয়ে চড়ুইয়ের বাসায় চড়ুই ছানাকে রেখে তবে শান্তি। কিন্তু আসল গল্পটাই তো বলা হচ্ছে না। ঐ এয়ারগানের গল্প। বন্দুক একদিন নজরুলের দখলে। কী করা হচ্ছে সেটা দিয়ে? আমরা জানি, পাখির ধারেকাছে সে নেই। তবে? সে-গল্পও শুনিয়েছেন শৈলজানন্দ-

            বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গেলাম নির্জন কবরখানায়। বন্দুকটা নজরুলের হাতে দিয়ে বললাম, মারো এইবার যত পারো। অথচ নজরুল সে রাস্তায় মাড়লেন না। গোরস্থানের একদিকে সারি সারি কয়েকটি ইট-বাঁধানো বেদীই হল তার লক্ষ্য। একটি হলো ছোটলাট, একটি হলো ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেস, আর একটি হলো এস্-ডি-ও। তারপর একের পর এক চলতে লাগল তাদের ওপর আক্রমণ। গোল গোল সীসের গুলি এয়ারগানের নলের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে ফটাস্ ফটাস্ করে লাগল গিয়ে দেশের শত্রু ইংরেজদের গায়ে। একটা গুলি লাগে আর নজরুলের সে কী উল¬াস!

            নজরুলকে তখন বলেছিলাম- ওরা কি দোষ করলে বল তো? বড়লাট, ছোটলাট-ওরা তো চাকরি করে, ওরা কর্মচারী।            নজরুল বলেছিল- না, ওরা ইংরেজের প্রতিনিধি। ইংরেজ মাত্রই আমাদের শত্রু। ওরা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাক। নইলে তুমি ওদের মেরে তাড়াবে?- চেষ্টা করব। প্রাণের ভয়ে এদেশে কেউ আসতে চাইবে না।তিনদিন লাগল নজরুলের হাত ঠিক করতে। পেঁপে গাছটাই হল বড়লাট। নজরুলকে সেদিন বললাম- চল যাই পঞ্চুর কাছে। আরও কিছু র্ছরা নিয়ে আসি। নজরুল বলল- দাঁড়াও, ওর পঞ্চম জর্জকে মারি আগে।বললাম- না না ও বেচারা অনেক দূরে থাকে। ওর সঙ্গে আমাদের কি সম্বন্ধ? নজরুল বললে- ওই তো পালের ধাড়ি। ও তো ফট করে এক দিন সবাইকে ডেকে বলে দিতে পারে, ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিয়ে দিলাম। ব্যাস্, একদিনেই আমরা স্বাধীন।

ইংরেজরা এদেশ ছেড়ে স্বেচ্ছায় যেতে না চাইলে মেরে তাড়াতে হবে। শুরু হলো স্বদেশী আন্দোলন। আর সন্ত্রাসবাদ? ও তো ইংরেজদেরই বুলি- টেররিষ্ট, টেররিজম। বাংলার কিশোর ও যুব সমাজকে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত করাই হলো বিপ্ল¬বী প্রতিষ্টানের মূল লক্ষ্য। শুরু হলো বিপ্লবী আন্দোলন, বেশির ভাগই কিশোর এবং তরুণ। ক্ষুদিরামের যখন ফাঁসি হল তখন সে মাত্র উনিশ বছরের তরুণ। আর তার সঙ্গী প্রফুল¬ চাকী নিজের বুক তাক করে পিস্তলের ট্রিগার টিপল। এমন অসংখ্য ক্ষুদিরাম-প্রফুল¬ চাকী বাংলার মায়ের কোল আলো করে আসে সেদিন। এই যুগের শ্রেষ্ট গৌরবগাথা রচিত হয়েছিল চাটগাঁর জালালাবাদ পাহাড়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ভিতর দিয়ে।

সে-যুগের কথা পড়তে পড়তে আজও আমাদের লোমকূপ শিউরে ওঠে আবেগে, উত্তেজনায়, গর্বে। হায়, আমরাও তো সেই একই বাঙালি। অথচ কী অক্ষম, ভীরু, স্বার্থপর, দেশপ্রেমহীন। আজ এতটুকুও কি বোঝার উপায় আছে, আজকের এই সব শৃগালের পূর্ব পুরুষ ছিলেন ঐ সিংহের দল। মাষ্টারমশাই নিবারণ ঘটকের চোখে পড়েছিল এই বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ দরিদ্র ছাত্রটি, যার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। রাজনীতি, বিপ¬ব, পরাধীনতা, দেশের জন্যে যুদ্ধ- এই সমস্ত চিন্তা ও বোধ ধীরে ধীরে ছাত্রটির মনে এই মাষ্টারমশাই ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের দেশছাড়া করবে।

শিয়াড়শোল স্কুলের মাষ্টারমশাই সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল ছিলেন গান পাগল মানুষ, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা করেন। আর গান তো নজরুলের রক্তে। গুরু ও শিষ্য একে অন্যকে চিনে ফেলেন। মাষ্টারমশাইয়ের কাছে তালিম নেয় নুরু, তাঁর বাড়ি গিয়ে গলা সাধে। ও দিকে হাফিজ নুরুন্নবী সাহেরবের কাছ থেকে ফার্সি ও উর্দু জ্ঞান চর্চা। এদিকে একটা ঘটনা ঘটল রাণীগঞ্জ শহরে। মহা হৈ-চে কান্ড এক। বটগাছতলায় এক ফকির থাকতেন, একটা কথাও কখনো বলতেন না, যথার্থই মৌনী ফকির। এক দিন সেই ফকিরের ওপর দিয়ে গরুর গাড়ি চলে গেল। নজরুল তখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। ফকির, মনে হয়, রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে ছিলেন, গাড়োয়ান খেতে পান নি। চাচা চলে গেল একেবারে বুকের ওপর দিয়ে। পাঁজর ভেঙ্গে গেল, রক্তাক্ত ব্যাপার। লোক জমে গেল, পুলিশ এল। গাড়োয়ানকে বেঁধে রাখল একটা গাছের সঙ্গে, হাজতে চালান করে দেবে। ফকির তখনও মারা য়ান নি; ধুঁকছেন, প্রাণটা বেরিয়ে গেলেই হয় এমন অবস্থা। মৃত্যুশয্যাতেই ক্ষীণকন্ঠে তিনি বললেন- ‘এ তো সৌভাগ্য যে ঐ গাড়োয়ান এসে আমাকে ছুটি দিয়েছে, ও আমার মুক্তিদাতা। বাবা পুলিশ, তুমি এই দশটা টাকা নিয়ে ওকে ছেড়ে দাও”। পুলিশ তো কেঁদে আকুল। “আমি পুলিশ বলে কি এমনই পাষন্ড! বাবা ফকির, আপনি যখন ক্ষমা করতে পারলেন তখন আমি কেন একে ধরে রাখব? পুলিশের চাকরি করি বলে কি এতই নীচ হয়ে গেছি যে আপনার হাত থেকে এ-জন্যে টাকা নেব?” ফকির বললেন- “তা হলে বাবা, টাকাটা গাড়োয়ানকেই দাও। ও বড়ো গরিব মানুষ”। মৌনী সাধুকে এই-ই প্রথম সবাই কথা বলতে শুনল। এ ক’টা কথা বলেই ফকির মারা গেলেন। নজরুল স্বচক্ষে দেখা প্রত্যক্ষ ঘটনা। পীর-ফকির সাধু-সন্ন্যাসীতে ভক্তি তার বরাবরই ছিল। ধর্মের আবহাওয়াতেই তার শৈশব কেটেছে তো! সমস্ত ঘটনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। সবটাই সে লিখে ফেলল। ছাপা হয়েছিল রচিত হওয়ার চার বৎসর পরে। “ক্ষমা” পরিবর্তিত হয়ে তখন নাম হয়েছিল “মুক্তি” ।

শিয়াড়শোল স্কুলে, রাণীগঞ্জে ছাত্রজীবন মন্দ কাটছে না। কোলাহলমুখর বন্ধনহীন দিন। সাথে পড়াশোনা চলছে, তবে তার চেয়ে বেশি সময় কেড়ে নিচ্ছে সাঁতার কাটা, এয়ারগানে পেঁপে শিকার, সঙ্গীত চর্চা, গল্প-কবিতা মশকো করা তারই মধ্যে একদিন- শুরু হলো বিশ্বযুদ্ধ, মানে পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ। সময়টা ১৯১৭ সাল। ইংরেজ আর জার্মানদের মধ্যে। যুদ্ধে যাচ্ছে নুরু। নজরুলকে ভর্তি করে নেওয়া হল উনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট। দুখু মিঞা আর নুরুর গল্প এখানেই শেষ হল। শেষ হল কবি নজরুলের জীবনের প্রথম পর্ব। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধ শেষ, যুদ্ধের প্রয়োজনে সাময়িকভাবে তৈরি বাঙ্গালি পল্টন-বাহিনীও শেষ।

সেনা-জীবনের পাট চুকিয়ে নজরুল চলে এলেন কলকাতায়, মাস দুয়েক পরেই, ১৯২০ সালের মার্চ মাসে। বাংলা সাহিত্যে, এদেশের সাংবাদিক জগতে, বাংলা গানে ঝটিকার বেগে এক আগন্তুক এসে প্রবেশ করলেন। এরপর উদ্দাম হাওয়ায় উড়বে জীবন, বেসামাল হবে পরিপার্শ্ব, সংসার। নজরুলের যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বের ইতিহাস সেই টালমাটাল কাহিনী। সব্যসাচীর মতোই হাল ধরে আছেন নতুন যুগের কবিতার, নতুন সময়ের রাজনীতি-সাংবাদিকতার, নতুন কালের বিদ্রোহ ও আবেগের, নতুন বাংলা গানের। কাজী নজরুল ইসলাম যাঁর নাম সেই অপরাজের ব্যক্তিত্বের উদয় ও অস্ত বাঙালির জাতি প্রত্যক্ষ করেছিল এই সময়ে। বাইশ বৎসর ধরে। কলকাতায় নজরুল থাকতে লাগলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। কমরেড মুজফফর আহমদের সঙ্গে একই কামরায়, শুরু হল যথার্থ সাহিত্যজীবন। ১৩২৮ সালের ২২শে পৌষে বের হল “বিদ্রোহী” কবিতা। রীতিমতো হৈ-চৈ পড়ে গেল। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন নজরুল। তারপর ১৯২০ সালে ১২ই জুলাই “নবযুগ” পত্রিকা। সম্পাদনায় ছিলেন নজরুল ও মুজফফর আহমদ। পত্রিকা বের করা হচ্ছে, লেখাপত্তর চলছে- কিন্তু কবির প্রাণশক্তি কি এতেই নিঃশেষিত হচ্ছিল? সঙ্গীতের নেশা, পরিচিত বন্ধুদের আড্ডায় নজরুল সর্বদা একাই এক’শ। বেঠকী গল্প তৎসঙ্গে অফুরন্ত চা পান, মাঝেমাঝে পান-জর্দা, ছাদ-কাঁপানো দুর্বার অট্টহাসি এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত।

১৯১২ সালের ১১ই আগষ্ট বের করলেন অর্ধসাপ্তাহিক সংবাদপত্র “ধূমকেতু”। নিজেকে নজরুল কাগজের সম্পাদক বললেন না; বললেন, “সারথি”। কাগজ বেরুবার দেড় মাস পরেই নজরুল একটি কবিতা লিখলেন “ধূমকেতু” তেঃ “আনন্দময়ীর আগমনে”। ভীরুদের প্রতি প্রচন্ড ধিক্কার, ব্রিটিশ- সমর্থকদেও প্রতি দুর্বার ঘৃণা, আর দেশপ্রেমীদের কাছে বিদ্রোহের ডাক- এই হল কবিতার মূল সুর। পুলিশের চোখে পড়েগেল। কবির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হল। প্রায় দু’মাস পর কুমিল¬া থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নিয়ে এল। র্কোটে বিচার শুরু হল। এক বৎসর সশ্রম কারাদন্ড। কবিতা রচনার জন্য কারাবরণ কোনো বাঙালি কবির ভাগ্যে এই প্রথম ঘটল।

দুখু মিঞা লেটোর গান বেঁধেছিল। সে কোন সুদূর অতীত, তখন সে কিশোর- বয়সী। গান আর তার সঙ্গছাড়া হয় নি। নজরুল আছেন অথচ গান নেই, এমন অবস্থা অকল্পনীয়। প্রথম দিকে গেয়েছেন কেবল রবীন্দ্রনাথের গান। পরে নিজে একসময় গান লিখতে শুরু করলেন, নিজে সুর দিলেন, তখন থেকে নিজেই গাইতে লাগলেন নিজের গান। ইতোমধ্যে কিন্তু নজরুল এক অসাধ্যসাধন করে বসে আছেন, গানেরই ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষায় তিনি গজল লিখলেন। বাংলা সঙ্গীতে নতুন একটি ধারার জন্ম হল। ইসলামি গান, সেই সঙ্গে লিখতে লাগলেন শ্যামাসঙ্গীতও। ধর্মপ্রাণ হুজুগের জাতি বাঙালি; গানের কথা ও সুরের জাদুতে আপ্লুত হল হিন্দু ও মুসলমান। এক কথায়-বাংলা গানের সাম্রাজ্য তিনি জয় করে নিলেন। তাঁর এই সৃজনশীলতা তিনি স্তব্ধ হওয়ার পূর্বে আর থামে নি। সিনেমা-জগতেও তিনি প্রবেশ করেছিলেনঃ চলচ্চিত্রের কাহিনী নির্মাণ করেছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন, সঙ্গতি পরিচালনা করেছেন, এমনকি অভিনয়ও করেছেন একটি ছবিতে। সবই কিছু আগে-পরের ঘটনা।

১৯৪২ সালের জুলাই মাস, ৯ই জুলাই কলকাতা বেতারে ছোটদের নজরুল গল্প আসরে হঠাৎ করে কবি দু-একটি কথা বলেই থেমে গেলেন। কবির এই অসুস্থতা মানসিক। দেশের চিকিৎসায় কোনো ফল পাওয়া গেল না। তখন বিদেশে পাঠানো হল। কবি তো নিঃস্ব। “নজরুল সংবর্ধনা কমিটি” তৈরি করে চাঁদা তুলে টাকা জোগাড় করে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। প্রথমে লন্ডনে, পরে সেখান থেকেই ভিয়েনায়। রোগ শনাক্ত চূড়ান্তভাবে হল ভিয়েনাতে। ডাক্তার হান্স হফ্ রায় দিলেন- কবির অসুখের নাম “পিকস্ ডিজিজ”, মস্তিস্কের কিছু বিশেষ স্নায়ুতন্ত্রী শুকিয়ে গেছে, ভালো হওয়া অসম্ভব।

ইতোমধ্যে নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে- বাংলাদেশ। তাঁর জন্মভুমি না হলেও এদেশের শহরে গ্রামে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছন কৈশোরে, যৌবনে। জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশে কবিকে কলকাতা থেকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। শুধু কবিকে নয়, তাঁর পরিবারবর্গকেও। ১৯৭২ সালের ২৪শে মে ঢাকায় পদার্পণ করলেন কবি, দীর্ঘ ৩২ বৎসর পরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি. লিট. উপাধি দিলেন ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫-এর ফেব্রুয়ারী মাসে “একুশের পদক” দেওয়া হল তাঁকে। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে “জগত্তারিণী” পুরস্কার প্রদান করে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ডি. লিট. অর্পণ করে ১৯৬৯ সালে, আর ভারত সরকার “পদ্মভূষণ” উপাধি দেয় ১৯৬০ সালে।

সেদিন ছিল ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগষ্ট। বাংলা ১৩৮৩ সনের ১২ই ভাদ্র। রবিবার। সময় সকাল ১০টা ১০ মিনিট। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন তিনি। তাঁকে কবর দেওয়া হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের পাশে।

এ কোন কবি জন্মেছিলেন বাংলাদেশের মাটিতে! সে কি ভুল করে? জাতীয় কবি? নিশ্চয়ই। কিন্তু সে-জাতির নাম বাঙালি। নজরুল কি শুধুই কোনো-এক বাঙালি কবির নাম? নজরুল মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস ও শক্তি, বিদ্রোহের জন্যে বুকের ভিতরে আগুন। মুক্তিপাগল পরাধীন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরনা; দুর্বার সংগ্রামী এক দুঃসাহসী যুবক।

তথ্য সূত্রে হায়াৎ মামুদ (নজরুল ইসলাম কিশোর জীবনী)

All News

বিয়ে কি, কেন এবং কিভাবে করবেন?

এ বি এম মুহিউদ্দীন ফারাদী (পর্ব-১, ভূমিকা) বুঝ হওয়া মাত্র প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে কল্পনার মানসপটে চুপিচুপি এমন একজনের ছবি আঁকে এবং আনমনে এমন একজনের কথা ভাবে, যাকে সে একান্ত আপন করে কাছে পেতে চায়। মনের অজান্তে তাকে ঘিরে রচিত হয় স্বপ্ন প্রাসাদ। কে হবে তার সুখ-দুঃখের চির সাথী, বন্ধু ও প্রিয়জন?Read More

ইচ্ছে